Wednesday, July 4, 2018

মাতৃভূমির পথেঃ (শেষ পর্ব)

(শেষ পর্ব)

মাতৃভূমির পথেঃ

কলম্বো থেকে কুয়ালালামপুরের ফ্লাইট সকাল ১০.৪৫ এ। অপরূপ সিলোন দ্বীপ ত্যাগ করতে খুব ভোরে প্রস্তুতি নিলাম। আগের দিন পরিচিত হওয়া সাবা ঢাকা ফিরবে একই ফ্লাইটে তাই সকাল সাতটায় সে এয়ারপোর্টে যাওয়ার পথে আমাকে গাড়ীতে তুলে নিলো। সাবা ‘ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটি অব শ্রীলংকা’ র ছাত্রী, একবছর হলো পড়ালেখার জন্য শ্রীলংকায় পাড়ি জমিয়েছে। দীর্ঘদিন পর ছুটি কাটাতে ঢাকা ফিরছে। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার সেই মোহাম্মাদই। স্নিগ্ধ সকালে কলম্বো দেখতে দেখতে চলে এলাম এয়ারপোর্ট। বোর্ডিং  পাস নিয়ে ইমিগ্রেশন কমপ্লিট করে অপেক্ষা করতে করতে ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে এলো ।

কুয়ালালামপুর পৌছলাম বিকাল ৫ টায়। রাত ১০ টায় ঢাকার ফ্লাইট মাঝখানে পাঁচ ঘন্টা ট্রানজিট। সাবাকে রাত ৮টার ঢাকার ফ্লাইটে তুলে দিয়ে কুয়ালালামপুরের বিশাল এয়ারপোর্টে ঘুরতে শুরু করলাম। পৃথিবীর  বড় ও ব্যস্ততম বিমানবন্দর গুলোর মধ্যে অন্যতম কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর। এখানে প্রতি ৩ মিনিটে অন্তত একটি  বিমান  উঠানামা করে। দেশি বিদেশী অসংখ্য ফ্লাইটের কাংখিত ট্রানজিট কুয়ালালমপুর। পর্যটন শিল্পপ্রধান দেশ ও ট্রানজিটের কারণে প্রচুর বিদেশী নাগরিকের উপস্থিতি বিমানবন্দরে। টার্মিনালে দেশী বিদেশী ডিউটি ফ্রি শপ, রেষ্টুরেন্ট, বার, রেষ্ট রুম সবকিছুই রয়েছে। ডিউটি  ফ্রি শপগুলো বেশ জমজমাট আবার কোন কোন স্থান একেবারের জনশূন্য। হেল্প ডেস্কের সহায়তায় টার্মিনাল জেনে এয়ারপোর্ট ট্রেনে উঠে পড়লাম। বিশাল বিমানবন্দরের একাধিক বিল্ডিং, এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং এ যাতায়াতের জন্য এই ট্রেনের ব্যবস্থা। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লাম বেঞ্চিতে, সবাইর ভাগ্যে চেয়ার না জুটায় অনেকে ঝকঝকে পরিস্কার ফ্লোরে জায়গা করে নিয়েছে।

লাউড স্পীকারের ঘোষনায় “গেট জি”র লম্বা লাইনের শেষে দাঁড়ালাম। কাছাকাছি সময়ে বেশ কয়েকটি ফ্লাইটের যাত্রীদের একই গেট হওয়ায় লম্বা লাইন। ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে আসায় নিরাপত্তাকর্মীরা হিমমিশ খাচ্ছেন। লম্বা লাইনে ক্ষনিকটা উদ্বিগ্ন হলাম কিন্তু ঢাকার ফ্লাইটের আলাদা লাইন তৈরী করায় দ্রুত চেকিং শেষ করে বোর্ডিং সম্পন্ন করলাম। ব্যাগ বিমানের লাগেজে এ দেয়া, তাই হাতে মোবাইল ছাড়া  কিছুই না থাকায় একবারেই রিল্যাক্স। ফ্লাইট ‘ওডি ৬১’ একঘন্টা দেরীতে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। উইন্ডো সীট থেকে রাতের ঝলমলে কুয়ালালামপুরের দেখা মিললো। শ্রেণীবদ্ধ আলোর ঝলকানিতে একটি সাজানো ও পরিকল্পিত নগরীর প্রমাণ বহন করে। পাশের সিটের যাত্রীর সাথে পরিচিত হলাম। ঢাকা পৌছানো পর্যন্ত দীর্ঘ পথ তার সাথে আলাপ আলোচনায় কেটে গেলো।

রানওয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় ঢাকার আকাশ থেকে রানওয়ের দেখা পাওয়া মুশকিল। অবশেষে রাত ১২.৪৫ এ কুয়াশার চাদরের মাঝে বিমান নিরাপদে অবতরণ করলো। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন ও বেল্ট থেকে ব্যাগ নিয়ে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। কুয়ালালামপুর আর কলম্বো বিমানবন্দরের সাথে ঢাকার বিমানবন্দরের পার্থক্যটা সুষ্পষ্ট। পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সেবার মান, সৌন্দর্য্য, অফিসারদের ব্যবহার সবকিছুতেই বেশ তফাৎ। চেক আউটে আমার ব্যাগ দুটি  অল্প ঝামেলায় পার পেয়েছে কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকদের  চরম হয়রানীর শিকার হতে দেখে খারাপ লাগলো। 

মোবাইল চালু করে উবার ডেকে উঠে পড়লাম। রাত দেড়টায় জ্যামের শিকার হয়ে কম সময়ে বাসায় পৌছার আশায় গুড়েবালি। শ্রীলংকার নিয়ম-শৃংখলার শহরে ঘুরে ভুলে গেছিলাম ঢাকার চিত্র। নিত্যদিনের পরিচিত ঢাকায় ফিরে এসেছি, গভীর রাতের জ্যাম আর বিভিন্নস্থানে পুলিশের চেকিং এ পড়ে বুঝতে পারলাম। পল্টনের বাসায় পৌছতে ঘড়ির কাটা রাত দু‘টার সংকেত দিলো।

শেষকথাঃ

শ্রীলংকা আয়তনে খুব বড় নয়, ছোট্ট একটি দ্বীপ নিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ দেশ। ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধে দ্বীপ রাষ্ট্রটির শান্তি বিঘ্নিত ও বিধ্বস্ত হলেও পুনরায় হারানো ঐতিহ্যে পথে ধাবিত হচ্ছে। সম্প্রীতির জনপদে এডামস পিকের কারণে মুসলিম, বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রীস্টান সব ধর্মালম্বীদের নিকট শ্রীলংকা আগ্রহের দ্বীপ। এছাড়াও অনুরাধাপুরা, সিগিরিয়া তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে। মহান পরিব্রাজক ইবনে বতুতা 1344 সালে সিলোন দ্বীপ ভ্রমণ করেন এবং এডামস পিক দর্শণে যান। পুর্তগীজ, ডাচ, ইংরেজরা এসে দ্বীপরাষ্ট্রের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং শতশত বছর শাসন ও উন্নয়ন সাধন করেন। মাত্র নয় বছর পূর্বে শেষ হওয়া গৃহযুদ্ধ পর শ্রীলংকানরা তাদের হাজার বছরের স্থানীয়  এবং ডাচ-ব্রিটিশদের ঐতিহ্য লালন করে দ্রুতই যে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে তা সত্যিই লক্ষ্যণীয়।

এডমস পিক,  সিগিরিয়া, এ্যালিফ্যান্ট অরফানেজ, জাফনা, অনুরাধাপুরা, ডাম্বুলা, ইষ্টার্ন  প্রোভিন্স সহ আরো অনেক কিছু দেখার ইচ্ছা থাকলেও  ভ্রমনের সংক্ষিপ্ত সময়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। শফিক  ও খায়রুল ভাইকে সঙ্গী হিসেবে পেলে সফর নিঃসন্দেহে আরো  উপভোগ্য ও প্রাণবন্ত  হতো। তবে শ্রীলংকায় একাকী  লম্বা  ভ্রমণ একেবারে খারাপ হয়নি। একাকী ভ্রমণকে নিজের মতো করে নিতে পারলে আরো উপভোগ্য হয়। নতুন পরিবেশ, নতুন অভিজ্ঞতায় শেখা ও জানা যায় অনেক কিছু। বিশ্বব্যাপী যারা ভ্রমণ করেন তারা অধিকাংশই একাকী ভ্রমণ করেন, সঙ্গী খুঁজে নেন স্থানে স্থানে।

নতুন একটি দেশ, সমাজ, জাতির সাথে পরিচিত হয়ে বিশ্ব ভ্রমণে মনের খোরাক কিছুটা মেটানোর চেষ্টা করেছি। দেখেছি, জেনেছি, শিখেছি, অনুভব করেছি অনেক কিছুই। সুযোগ পেলে ইবনে বতুতার মতো বিশ্ব ভ্রমণে বের হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে থাকবে আর ধীরে  ধীরে  এর পাল্লা ভারী  হতে  থাকবে এটা নিশ্চিত সেই চিন্তা থেকে পরবর্তী ভ্রমনের চিন্তা ইতিমধ্যেই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।

..............................
....সমাপ্ত।

No comments:

Post a Comment