Wednesday, July 4, 2018

বিজয় দিবস ও এক টুকরো বাংলাদেশঃ (পঞ্চম পর্ব)

(পঞ্চম পর্ব)

বিজয় দিবস ও এক টুকরো বাংলাদেশঃ

১৬ ডিসেম্বর, শ্রীলংকায় শেষ দিন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৬ ডিসেম্বর সকালে কলম্বোতে বাংলদেশের হাইকমিশন আয়োজিত বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে প্রস্তুতি নিলাম।শ্রীলংকার প্রবাসী বাংলাদেশীরা দেশীয় উৎসব ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহন করে হাইকমিশনের দেয়াল ঘেরা অংশটুকুকে এক টুকরো বাংলাদেশে পরিণত করেন। দেশের বাহিরে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে অনেক বাংলাদেশীদের সাথে সাক্ষাৎ পাওয়া এবং প্রাণ খুলে মায়ের ভাষায় কথা বলার সুযোগ হবে বলে বেশ আগ্রহান্বিত ও উদগ্রীব ছিলাম।

শনিবার ছুটির দিনে ঝলমলে উজ্জ্বল কলম্বোর রাস্তায় গাড়ীর সংখ্যা কম, ট্রাফিক জ্যাম নেই বললেই চলে। মামুন ও রাফাত ভাই সহ চলে এলাম বাংলাদেশ হাইকমিশনে। শ্রীলংকায় অবস্থানরত বাংলাদেশী সংখ্যা খুব বেশী নয়। হাইকমিশনে বিভিন্ন বয়সের প্রায় শখানেক বাংলাদেশী উপস্থিত হওয়ায় হাইকমিশন একখন্ড সবুজ বাংলাদেশে পরিনত হয়েছে। অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে হাইকমিশনের সবুজ প্রাঙ্গনে মিষ্টি রোদে সবাই আড্ডায় মগ্ন। অনেকদিন পর একসাথে অনেক স্বদেশীকে পেয়ে সবাই বেশ আনন্দিত ও উচ্ছ্বাসিত। অনেকেই পরিবারের সকল সদস্যসহ লাল সবুজের পোষাকে অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছেন।

সকাল সাড়ে এগারোটায় লাল সবুজের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। গর্বের লাল সুবজ পতাকা উত্তোলনের সাথে সাথে বেজে উঠলো জাতীয় সঙ্গীত ‘‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’’। ধীরে ধীরে উড্ডিন হতে থাকা পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের সুর মনে আবেগ ও দেশপ্রেম তৈরী করে, বিনম্র শ্রদ্ধা আর গর্বে শীর উচ্চকিত হয়। উচ্চকিত পতাকা আমাদের গর্ব, এ বিজয় দিবস আমাদের ঐহিত্য।

দেশের মাটিতে স্বাধীন বাংলাদেশ ও লাল সবুজের পতাকার মহত্ব বুঝা না গেলেও, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মহত্ব অনুধাবন করা যায় দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে পা রাখলেই।যেখানে পরিচয় সবুজ পাসপোর্ট আর বাংলাদেশী হিসেবে, সেখানে “আমি বাংলাদেশী“ এ কথা বলতে পারলেই গর্বে বুক ফুলে যায়। দেশটাকে আরো বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। বিদেশের মাটিতে প্রবাসীরা ভালো অবস্থায় থাকলেও শেষ নিঃশ্বাস নিজের দেশের স্বাধীন বাতাসেই ত্যাগ করতে চায়। দাফন-কাফন নিজে দেশেই যাতে হয় সেজন্য আকুতি করে। যদিও নিজেদের নানা সমস্যার কারণে বিদেশে অপমান অপদস্ত হতে হয় তবুও বাংলাদেশী পরিচয়ে মনে সুখ তৈরী হয়।এ স্বর্গীয় অনুভূতিকেই সম্ভবত দেশপ্রেম আর মাতৃভূমির টান বলা হয়।

মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি, হাইকমিশনারসহ অন্যান্য অতিথিবৃন্দ বক্তব্য প্রদান করেন, সকলের সাথে স্বাধীনতা ও বিজয়ের গল্প করেন। শ্রীলংকায় আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাব্বির রহমান, মুন জামান, সোহরাব রুবেলসহ হাতে গোনা যে কয়জন পড়ালেখা করেন তাদের অধিকাংশই উপস্থিত হয়েছেন। রুবেলের ভূটানীজ বন্ধু রোহিত অধিকারীও এ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছে। তারা ছাড়াও সমবয়সী অন্যান্যদের সাথে পরিচিত ও বন্ধুত্ব তৈরী হয়েছে ইতিমধ্যেই। তাদের সাথে কাটানো সময়গুলোতে মনে হয়নি ইতিপূর্বে কখনো আমাদের সাক্ষাৎ বা পরিচয় হয়নি, বন্ধুত্বপূর্ণ সময়গুলো খুব দ্রুত কেটে গেছে। নৌ বাহিনীর অফিসার জাকির সাহেব হাইকমিশনের নিরাপত্তা অফিসার, পরিচয়ের ফাঁকে অনেক কথা হলো। হাইকমিশনে কর্মরত শ্রীলংকার দুই সুন্দরী তরুনী সাওরি ও রিজলা রায়ানও বাংলাদেশী ঐতিহ্যের শাড়ী পড়ে অনুষ্ঠানে এসেছে। তারা সবাইকে অভিনন্দন জানান এবং বেশ আন্তরিক ব্যবহার করেন। হাইকমিশন অনুষ্ঠানে দেশীয় খাবারের আয়োজন করেছে। খিচুরী, সাদা ভাত, বেগুন ভাজি, আলু ভর্তা, রোষ্ট, গরুর গোশত, মাছ, মিষ্টি ইত্যাদি খাবারের বিশাল সম্ভার। সবার সাথে উৎসবমুখর পরিবেশে এক সপ্তাহ পর দেশীয় খাবারের স্বাদ গ্রহন করাটা অমৃত। প্রবাসী বাঙ্গালীদের জন্য সুন্দর একটি দিনে আনন্দ বিরাজ করছে হাইকমিশন প্রাঙ্গনে। বয়স্করা নানা আলোচনায়, তরুন-যুবকেরা আড্ডায়, নারীরা বহুদিন পরের মজমায় আর বাচ্চারা খেলাধূলায় আনন্দঘন সময় কাটাচ্ছেন। মনের আবেগ আর আনন্দ প্রকাশের মাত্রা দেখেই বুঝা যায় স্বদেশীকে কাছে পেয়ে সবাই কতটা খুশি।

আনন্দঘন সময় কাটিয়ে সবার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। বিকেলে বের হলাম কেনা-কাটার জন্য, হোটেলের সামনেই বিশাল শপিং মল হওয়ায় দূর যেতে হলো না। শ্রীলংকার ঐতিহ্যবাহী চা কেনা আর অন্যকিছু কেনা যায় কিনা দেখা হলো উদ্দেশ্য। কয়েকশ ফ্লেভারের চা তৈরী করে মালেসনা কোম্পানী আর গিফট বক্স হিসেবে বাসিলার টি বুকগুলো এক কথায় আকর্ষনীয়। শপিং মলে সাক্ষাৎ পেলাম ঢাকার মেয়ে সাবা ও তার নিগ্রো বান্ধবীর সাথে। সাবার মামা ইটালী থেকে নৌ বাহিনীর জাহাজে চিটাগাং যাচ্ছেন। কলম্বো নোঙ্গড় ফেলে ভাগনীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। বাঙ্গালী আড্ডা আর কফি শেষে সবাইকে বিদায় দিয়ে হোটেলে ফিরলাম। চা ছাড়া কিছুই কেনা হয়নি তাই আবার শপিংমলে একাই ঘুরলাম কিন্তু জিনিসের দাম তুলনামূলক বেশী হওয়ায় শুধু শ্রীলংকার সংবিধান বিষয়ক একটি বই কেনা হলো।জিনিসের দাম বেশী হওয়ার কারণ হলো, নিজস্ব উৎপাদিত পন্য খুব কম। একটি দোকানে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’এর ট্যাগ লাগানো টি শার্ট দেখে বেশ ভালো লাগলো।

শ্রীলংকার শেষ সন্ধ্যা উপভোগ্য করতে কলম্বো শহরে আরেকবার বের হলাম। হেঁটে বিভিন্ন সড়ক ঘুরে পৌঁছলাম গল ফেস বীচে। ছুটির সন্ধ্যায় হাজারো মানুষ এখানে জড়ো হয়েছে সুন্দর সময় কাটাতে। বিদেশীরা সহ অসংখ্য তরুন তরুনীরা ফানুস উড়িয়ে ভালবাসার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। আনন্দঘন পরিবেশকে সাগরের শো শো শব্দ ও নির্মল বাতাস উপভোগ্য করে তুলেছে। বাঁধের উপর ষ্ট্রীট ফুডের দোকানের পরটা আর চিংড়ির স্বাদ অসাধারণ। দীর্ঘ সময় সমুদ্র বিলাস শেষে হাঁটা দিলাম হোটেলের দিকে। পথে ইন্ডিয়ান মুসলিম রেষ্টুরেন্টে নুডুলসের অর্ডার দিলাম। অতিরিক্ত লবণের কারণে নুডুলসের স্বাদ নষ্ট হয়েছে তাই শেষ না করেই উঠে আসার প্রস্তুতি নিলে তারা আরেকবার তৈরী করে দিলো তাদের সম্মানে ফেলে না এসে হোটেল পর্যন্ত পার্সেল নিয়ে আসলাম। তবে নুডুসল আর খাওয়া সম্ভব নয় বলে ফেলে দিতে হলো। পরদিন সকালে শ্রীলংকা ত্যাগ করতে হবে, তাই হোটেলের বিল পরিশোধ আর ব্যাগ গুছিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। সকালে মামুনের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ থাকবেনা তাই অনেক রাতে মামুন হোটেলে আসলো আমাকে জানাতে। তাকে শ্রীলংকার নিরাপদ, নিরিবিলি সড়কে গাড়ীতে তুলে দিয়ে শ্রীলংকায় শেষ রাতটা কাটানোর জন্য হোটেলের রুমে ফিরলাম।

................. আগামী পর্বে সমাপ্ত.............

No comments:

Post a Comment