(চতুর্থ পর্ব)
লিটল ইংল্যান্ড খ্যাত নূয়ারা এলিয়ায়ঃ
বিকাল সাড়ে তিনটায় ক্যান্ডি থেকে নূয়ারা এলিয়ার উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা শুরু হলো। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার পাহাড়ী আঁকাবাঁকা সরু পথ পেরিয়ে ৬১২৯ ফুট উপরের পাহাড়ী আলোর শহরে পৌঁছতে হবে। চারিদিকে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। গাড়ী পাহাড় বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। সর্পিল পাহাড়ী পথে সরলভাবে এক মিনিট বাস চলার আগেই আবার মোড় নিতে হয়। এ পথেই দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে স্কুটার, মোটর সাইকেল ইত্যাদি। কলম্বোর আবহাওয়া গরম অথচ এ পাহাড়ী জনপদে শীতের তীব্রতা বেশ। মেঘের ভেলা পাহাড়ের অনেক নিচ দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনো কখনো গাড়ী মেঘের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। যেকোন সময় বৃষ্টি হানা দিতে পারে। পাহাড়ের গায়ে বিস্তীর্ণ চা বাগান, বাড়ীঘর, জনবসতি, অবকাশ যাপনের সুন্দর হোটেল কিংবা রাস্তার ধারে ছোট দোকান, গ্রাম্য বাজারে পাহাড়ী পরিবেশকে করেছে চিত্রাকর্ষক। সন্ধ্যা না নামলেও পাহাড়ের আড়ালে সূর্য হারিয়ে গিয়েছে। বিরামহীন ভাবে দুচোখ এসব সৌন্দর্য্য উপভোগ করে যাচ্ছে।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গাড়ী একটি পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরুলেই চোখে পড়লো দূর পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য আলোর বিচ্ছুরণ। বহুদূর থেকেই সুন্দর একটি আলোকিত শহর দেখা যায় । অন্ধকার পাহাড়ে আলোর বিচ্ছুরণ তৈরীর কারণেই হয়তো এ শহরের নাম রাখা হয়েছে নূয়ারা এলিয়া বা আলোর শহর। নূয়ারা এলিয়ার বাসষ্ট্যান্ডে পৌছতেই চারিদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। ঠান্ডার তীব্রতায় গরম কাপড় না পড়ে উপায় নেই। মামুন তার পূর্ব পরিচিত আহমদের বাড়ীতে নিয়ে গেলো। মামুন আগে এখানে থাকার কারণে পরিবারটির সাথে তার ভালো সখ্যতা। নিচ তলার আহমদ পরিবারসহ বসবাস করে আর দোতালায় ৪ টি রুম পর্যটকদের ভাড়া দেয়। শ্রীলংকার পর্যটন এলাকাগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই এরকম ব্যবস্থা রয়েছে। রাতে অন্য কোন গেষ্ট না থাকায় বড় রুমটি বরাদ্দ পেলাম। ফ্রেস হয়ে আলোর শহরে একচক্কর ঘুরে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। রাতের নীরব ও শান্ত পরিবেশে শুধুমাত্র হোটেল ও বারগুলো বিদেশী অতিথিদের উপস্থিতিতে জমজমাট। পাহাড়ী পরিবেশে শীতের তীব্রতায় বাহিরে থাকার উপায় নেই, তাই দ্রুত ফিরে আসতে হলো।
খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গলে হাড় কাঁপানো শীতের তীব্রতা অনুভব করা গেলো। ঠান্ডা পানিতে হাত লাগানো দুস্কর তবে ওয়াশরুমে গরম পানির ব্যবস্থা থাকায় কিছুটা রক্ষা। ঠান্ডা উপেক্ষা করে সকাল আটটায় গোসল করে বাহিরে বেরিয়ে পড়লাম। সূর্যের তাপে শরীর গরম হওয়ার সম্ভবনা কম, তাই শীতের কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিতে হলো। কয়েকটি ঘরের দরজায় চাবি ঝুলতে দেখে অবাক লাগলো। মনে প্রশ্ন হলো, এখানে হয় চুরি করার লোক নেই কিংবা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার স্থান নাই। ছোট একটি দোকানে ঢুকে পরটা, ডিম, চা আর ভাজাপোড়া দিয়ে নাস্তা সেড়ে বিল দিতে হলো ৫৫০ রুপী। আমরা পায়ে হেঁটে বেড়ানোর সিন্ধান্ত নেয়ায় এক ঘোড়ার সহিস ঘোড়ায় ঘুরে দেখার জন্য ফুসলাতে চেষ্টা করলেও লাভ হলো না । ঘোড়ার মালিক আর দোকানদারের মুখে সাকিব মুশফিকের প্রশংসা শুনে ভালো লাগলো। পাহাড়ী মানুষগুলোর সাথে নিজের দেশের গল্প করে সেখান থেকে জনপদ দেখতে বেরিয়ে এলাম।
নূয়ারা এলিয়ার জনপদ দেখতে প্রথমেই রয়েল টার্ফ ক্লাব বা রেসকোর্স ময়দানে প্রবেশ করলাম। বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে অনেক ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্রিটিশরা ক্লাবে ঘোড়ার রেসের ট্র্যাক ও দুইদিকে গ্যালারি তৈরী করেছে। মাঠের এক প্রান্তে অল্প বয়সী ছেলেরা ক্রিকেট প্রাকটিস করছে। শ্রীলংকার ভালো ক্রিকেটার তৈরীর মাধ্যম স্থানীয় ক্রিকেট একাডেমীগুলো। সবুজ মাঠে চড়ে বেড়ানো সুন্দর ঘোড়াগুলোর সাথে পরিবেশের সৌন্দর্য্যে মিলেমিশে একাকার। ঠান্ডার মাঝে মিষ্টি রোদের তাপ আরামদায়ক তবে পকেট থেকে হাত বের করা কষ্টকর। মাঠ থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে গড়ে উঠা নূয়ারা এলিয়ার সুন্দর জনপদ দেখতে পাওয়া যায়। সবুজ পাহাড়ের গায়ে উজ্জ্বল রোদ ঝলমলে আলোর বিচ্ছুরণ তৈরী করেছে।
চললাম গ্রেগরি পার্কের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের মাঝে বিশাল লেকসহ গ্রেগরি পার্কে দেখার মতোও তেমন কিছু নেই তবে লেকের আশেপাশের এলাকাকে সুন্দর করে সাজিয়ে আকর্ষণীয় ও সৌন্দর্য্যের লীলাভূমিতে পরিনত করা হয়েছে। চারিদিকে সবুজ ঘাসের প্রান্তরে কাটিয়ে দেয়া যায় দীর্ঘ সময়। ছোট ছোট কাঠের ব্রীজ ও ল্যান্ডিংগুলো বেশ মনোরম। লেকে ঘুরে বেড়ানোর বিভিন্ন ধরনের বোটের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কিছু মিলিয়েই গ্রেগরি পার্কের সৌন্দর্য্য। লেক ঘুরতে দুপুর হয়ে এলে হঠাৎ বৃষ্টি এসে আগমন । এখানে বৃষ্টির ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই বলে একটি ছাতা সাথে রাখা বাঞ্চনীয়।
বৃষ্টির তাড়া খেয়ে সুন্দর একটি বুফে রেষ্টুরেন্টে আশ্রয় নিলাম। লেকের অপরূপ পরিবেশে উদর পুর্তি করার পাশাপাশি অবিরাম বৃষ্টি উপভোগ করা বাড়তি পাওনা। বাসমতি চালের ভাত, নানা পদের সবজি, ভর্তা, ডিম, ডাল, তরকারির খাবার খেয়ে দুই জনের বিল মাত্র ৬১০ রূপী, বেশ সাশ্রয়ী হওয়ায় আরো কয়েকবার এ রেষ্টুরেণ্টে খেয়েছি। বৃষ্টি থামলে বিকালে শহর ও ভিক্টোরিয়া পার্ক ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তুতি স্বরূপ বিশ্রামের জন্য রুমে ফিরে এলাম।
আবহাওয়া অনুকূলে নয় বিকেলে তাই ছাতা নিয়েই বেরুতে হলো। হঠাৎ বৃষ্টি আবার হঠাৎ নেই, মেঘ বৃষ্টির লুকোচুরিটা উপভোগ্য। বর্ণ ও চেহারার সাদৃশ্য থাকায় স্থানীয় নাগরিক হিসেবেই ঢুকলাম পার্কে। সুন্দর সাজানো গোছানো ভিক্টোরিয়া পার্ক খুব বড় নয়। অসংখ্য দেশী বিদেশী বৃক্ষ, ফুল গাছ, পাখি রয়েছে পার্কে। একদল পাখির ফটোগ্রাফার বড় বড় ক্যামেরা নিয়ে পাখির ছবি তুলে যাচ্ছে। তাদের ক্যামেরার তুলনায় আমার ডিএসএলআর গণনায় পড়েনা। বৃষ্টির কারণে দর্শনার্থী একেবারেই কম এবং অধিকাংশই বিদেশী। মরক্কো ও চাইনিজ দুটি পরিবার এবং ডেনিস বয়োবৃদ্ধ দম্পত্তির সাথে গল্প আর ছবি তুলে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় শহর দেখতে বেরিয়ে এলাম।
নূয়ারা এলিয়াকে শহর বললে ভুল হবে, মূল শহরটি আমাদের গ্রামাঞ্চলের বড় একটি বাজারের মতো তবে পাহাড়ী জনপদ বহুদূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। ব্রিটিশরা চা বাগান তৈরী এবং অবকাশ যাপনের জন্য এ পাহাড়ী জনপদ তৈরী করেছে। তারা বহুবছর আগে এখান থেকে চলে গেলেও এ পাহাড়ী জনপদ তাদের সব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। এখনো প্রতিটি বাড়ীঘর তৈরী হয় ব্রিটিশদের বাড়ীঘরের আদলে। এজন্য এ এলাকাকে বলা হয় “লিটল ইংল্যান্ড”। প্রাণকেন্দ্রেই ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীলংকার অন্যতম পুরাতন পোষ্ট অফিস। হিল ক্লাব, টার্ফ ক্লাব, ভিক্টোরিয়া পার্ক, গ্রেগরি পার্ক, পোষ্ট অফিস এসবই ব্রিটিশরা তাদের প্রয়োজন ও অবকাশ যাপনের জন্য তৈরী করেছে। তারা বসবাসের অনপুযুক্ত এ পাহাড়ী জনপদকে বসবাসের উপযুক্ত করেছে আর শ্রীলংকার জনগন তাদের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে নূয়ারা এলিয়াকে পর্যটকদের আকর্ষনীয় এলাকায় পরিনত করেছে।
সন্ধ্যার অন্ধকার ও ঠান্ডার প্রকোপে পাহাড়ী জনপদ নীরব হয়ে গেলো। এখানকার শেষ বাসটি অনেক আগেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে বা এখানে এসে পৌছে গিয়েছে। মদ পান অনুমোদিত বলে সকল সুপার শপে ভদকা, হুইস্কি, বিয়ারসহ দেশি বিদেশী নানা ব্রান্ডের মদ পাওয়া যায় এবং স্থানীয় দোকানগুলোতে ক্রেতা কম নয়। তবে শ্রীলংকায় ধূমপায়ীর সংখ্যা নিতান্তই কম, এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১০ জনকে ধূমপান করতে দেখেছি যাদের অধিকাংশই বিদেশী। সন্ধ্যার পর অন্ধকারের নীরব পাহাড়ী জনপদের মাঝে হেঁটে আলো আঁধারীর অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগের অনুভূতি অন্যরকম। অন্ধকারে কখনো কখনো গা ছমছম করলেও ভালোলাগার অনুভূতির কাছে তা একেবারেই নগন্য। চারিদিকের পরিবেশে মনে হয় এটা কোন শ্রীলংকার পাহাড়ী জনপদ নয় বরং ইংল্যান্ডের কোন পুরাতন শহর। আর এটাই নুয়ারা এলিয়ার সৌন্দর্য্য। রাতের খাবার খেতে আল মদীনা হোটেলে ঢুকে কত্তু রুটি অর্ডার দিলাম। নান রুটি আর চিকেন কেটে কেটে ঝুরাঝুরা করা হয়। স্বাদ একেবারে খারাপ না তাছাড়া বিকট শব্দে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া দেখে খাওয়ার আগ্রহটা এমনিতেই তৈরী হয়। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করা কষ্টকর বিধায় দেরী না করে রুমে ফিরে লেপের গরমে আশ্রয় নিলাম।
সকালে পশ্চিমের জানালা খুলে দিতেই পাহাড়ী অপরূপ সৌন্দর্য্য চোখে পড়লো। পাহাড়ের গাঁয়ে গড়ে উঠেছে সুন্দর একটি গ্রাম। রাতে এসব বাড়ী ও হোটেলের ঝলমলে আলোর ছড়াছড়ি আর দিনে সূর্যের ঠিকরে পড়া রশ্মির ঝলকানি ভিন্নরকম পরিবেশ ও সৌন্দর্য্যের প্রকাশ ঘটায়। চাদর জড়িয়ে হেঁটে চাঞ্চল্যহীন পাহাড়ী গ্রাম ঘুরতে খারাপ লাগেনা। ব্যস্ততা, তারাহুড়ার কোন লক্ষণ নেই। নাস্তা সেরে আশেপাশের চমৎকার কয়েকটি হোটেল দেখতে বের হলাম। পাহাড় কেটে অত্যন্ত সুন্দর অবয়বে নির্মিত এসব হোটেলে সাধারনত বিদেশীরাই অবকাশ যাপনে আসেন। কম বাজেটের কারণে এসব দামী হোটেলে থাকার সুযোগ না জুটলেও সৌন্দর্য্যের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হলো। বিশাল গলফ ক্লাবেও যথারীতি বিদেশীদের উপস্থিতি। ১৮৭৬ সালের ইংরেজের নির্মিত হিল ক্লাব একটি বড় টিলার উপরে নির্মিত। প্রায় দেড়শ বছরের এ ক্লাব ও সম্মুখে রাখা একটি পুরাতন আমলের গাড়ী এ স্থাপনার আভিজাত্যের প্রমাণ দেয়। সকাল দশটা অথচ পরিচ্ছনতা কর্মী ও সেন্ট্রির পাহারা ছাড়া চারিদিক একেবারেই নিস্তব্ধ। এসব ঐতিহ্যবাহী হোটেল ও বাড়ীঘরগুলো নূয়ারা এলিয়ার আভিজাত্য।
নূয়ারা এলিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। দুইদিনের ভাড়া চুকিয়ে আহমদের পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে কলম্বোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। কলম্বো ৬/৭ ঘন্টার দূরত্ব, তাই দেরী না করে আরেকবার আলোর শহর বা নূয়ারা এলিয়াকে দেখে গাড়ীতে উঠলাম। দুইদিনে পাহাড়ী জনপদ মায়াময়তায় আকর্ষণ তৈরী করেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য্য আর পাহাড়ী জনপদে আরো কয়টা দিন কাটানোর ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে হলো। আবারো একই পথে ধীরে ধীরে পাহাড়ী পথ বেয়ে সমতলে নেমে আসতে হবে। চারিদিকে স্রষ্টার অপার সৌন্দর্য্যরে মুগ্ধতা ছেয়ে গেলে পুরো সত্তায়। এ ধরনী প্রভু কত অপরূপ, বিচিত্র করে তৈরী করেছেন।
কলম্বোর উদ্দেশ্যে একটানা চলছে গাড়ী। বৃষ্টি, ট্রাফিক ও পরবর্তী দুই দিনের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের বিপরীতে কলম্বো পৌছতে বেশ বেগ পেতে হলো। রাত ৮.০০ নাগাদ কলম্বো পৌছ
লিটল ইংল্যান্ড খ্যাত নূয়ারা এলিয়ায়ঃ
বিকাল সাড়ে তিনটায় ক্যান্ডি থেকে নূয়ারা এলিয়ার উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা শুরু হলো। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার পাহাড়ী আঁকাবাঁকা সরু পথ পেরিয়ে ৬১২৯ ফুট উপরের পাহাড়ী আলোর শহরে পৌঁছতে হবে। চারিদিকে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। গাড়ী পাহাড় বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। সর্পিল পাহাড়ী পথে সরলভাবে এক মিনিট বাস চলার আগেই আবার মোড় নিতে হয়। এ পথেই দ্রুত গতিতে ছুটে চলছে স্কুটার, মোটর সাইকেল ইত্যাদি। কলম্বোর আবহাওয়া গরম অথচ এ পাহাড়ী জনপদে শীতের তীব্রতা বেশ। মেঘের ভেলা পাহাড়ের অনেক নিচ দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে, কখনো কখনো গাড়ী মেঘের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। যেকোন সময় বৃষ্টি হানা দিতে পারে। পাহাড়ের গায়ে বিস্তীর্ণ চা বাগান, বাড়ীঘর, জনবসতি, অবকাশ যাপনের সুন্দর হোটেল কিংবা রাস্তার ধারে ছোট দোকান, গ্রাম্য বাজারে পাহাড়ী পরিবেশকে করেছে চিত্রাকর্ষক। সন্ধ্যা না নামলেও পাহাড়ের আড়ালে সূর্য হারিয়ে গিয়েছে। বিরামহীন ভাবে দুচোখ এসব সৌন্দর্য্য উপভোগ করে যাচ্ছে।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে গাড়ী একটি পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরুলেই চোখে পড়লো দূর পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য আলোর বিচ্ছুরণ। বহুদূর থেকেই সুন্দর একটি আলোকিত শহর দেখা যায় । অন্ধকার পাহাড়ে আলোর বিচ্ছুরণ তৈরীর কারণেই হয়তো এ শহরের নাম রাখা হয়েছে নূয়ারা এলিয়া বা আলোর শহর। নূয়ারা এলিয়ার বাসষ্ট্যান্ডে পৌছতেই চারিদিক অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। ঠান্ডার তীব্রতায় গরম কাপড় না পড়ে উপায় নেই। মামুন তার পূর্ব পরিচিত আহমদের বাড়ীতে নিয়ে গেলো। মামুন আগে এখানে থাকার কারণে পরিবারটির সাথে তার ভালো সখ্যতা। নিচ তলার আহমদ পরিবারসহ বসবাস করে আর দোতালায় ৪ টি রুম পর্যটকদের ভাড়া দেয়। শ্রীলংকার পর্যটন এলাকাগুলোর প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই এরকম ব্যবস্থা রয়েছে। রাতে অন্য কোন গেষ্ট না থাকায় বড় রুমটি বরাদ্দ পেলাম। ফ্রেস হয়ে আলোর শহরে একচক্কর ঘুরে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। রাতের নীরব ও শান্ত পরিবেশে শুধুমাত্র হোটেল ও বারগুলো বিদেশী অতিথিদের উপস্থিতিতে জমজমাট। পাহাড়ী পরিবেশে শীতের তীব্রতায় বাহিরে থাকার উপায় নেই, তাই দ্রুত ফিরে আসতে হলো।
খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গলে হাড় কাঁপানো শীতের তীব্রতা অনুভব করা গেলো। ঠান্ডা পানিতে হাত লাগানো দুস্কর তবে ওয়াশরুমে গরম পানির ব্যবস্থা থাকায় কিছুটা রক্ষা। ঠান্ডা উপেক্ষা করে সকাল আটটায় গোসল করে বাহিরে বেরিয়ে পড়লাম। সূর্যের তাপে শরীর গরম হওয়ার সম্ভবনা কম, তাই শীতের কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিতে হলো। কয়েকটি ঘরের দরজায় চাবি ঝুলতে দেখে অবাক লাগলো। মনে প্রশ্ন হলো, এখানে হয় চুরি করার লোক নেই কিংবা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার স্থান নাই। ছোট একটি দোকানে ঢুকে পরটা, ডিম, চা আর ভাজাপোড়া দিয়ে নাস্তা সেড়ে বিল দিতে হলো ৫৫০ রুপী। আমরা পায়ে হেঁটে বেড়ানোর সিন্ধান্ত নেয়ায় এক ঘোড়ার সহিস ঘোড়ায় ঘুরে দেখার জন্য ফুসলাতে চেষ্টা করলেও লাভ হলো না । ঘোড়ার মালিক আর দোকানদারের মুখে সাকিব মুশফিকের প্রশংসা শুনে ভালো লাগলো। পাহাড়ী মানুষগুলোর সাথে নিজের দেশের গল্প করে সেখান থেকে জনপদ দেখতে বেরিয়ে এলাম।
নূয়ারা এলিয়ার জনপদ দেখতে প্রথমেই রয়েল টার্ফ ক্লাব বা রেসকোর্স ময়দানে প্রবেশ করলাম। বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তরে অনেক ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। ব্রিটিশরা ক্লাবে ঘোড়ার রেসের ট্র্যাক ও দুইদিকে গ্যালারি তৈরী করেছে। মাঠের এক প্রান্তে অল্প বয়সী ছেলেরা ক্রিকেট প্রাকটিস করছে। শ্রীলংকার ভালো ক্রিকেটার তৈরীর মাধ্যম স্থানীয় ক্রিকেট একাডেমীগুলো। সবুজ মাঠে চড়ে বেড়ানো সুন্দর ঘোড়াগুলোর সাথে পরিবেশের সৌন্দর্য্যে মিলেমিশে একাকার। ঠান্ডার মাঝে মিষ্টি রোদের তাপ আরামদায়ক তবে পকেট থেকে হাত বের করা কষ্টকর। মাঠ থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে গড়ে উঠা নূয়ারা এলিয়ার সুন্দর জনপদ দেখতে পাওয়া যায়। সবুজ পাহাড়ের গায়ে উজ্জ্বল রোদ ঝলমলে আলোর বিচ্ছুরণ তৈরী করেছে।
চললাম গ্রেগরি পার্কের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ের মাঝে বিশাল লেকসহ গ্রেগরি পার্কে দেখার মতোও তেমন কিছু নেই তবে লেকের আশেপাশের এলাকাকে সুন্দর করে সাজিয়ে আকর্ষণীয় ও সৌন্দর্য্যের লীলাভূমিতে পরিনত করা হয়েছে। চারিদিকে সবুজ ঘাসের প্রান্তরে কাটিয়ে দেয়া যায় দীর্ঘ সময়। ছোট ছোট কাঠের ব্রীজ ও ল্যান্ডিংগুলো বেশ মনোরম। লেকে ঘুরে বেড়ানোর বিভিন্ন ধরনের বোটের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব কিছু মিলিয়েই গ্রেগরি পার্কের সৌন্দর্য্য। লেক ঘুরতে দুপুর হয়ে এলে হঠাৎ বৃষ্টি এসে আগমন । এখানে বৃষ্টির ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই বলে একটি ছাতা সাথে রাখা বাঞ্চনীয়।
বৃষ্টির তাড়া খেয়ে সুন্দর একটি বুফে রেষ্টুরেন্টে আশ্রয় নিলাম। লেকের অপরূপ পরিবেশে উদর পুর্তি করার পাশাপাশি অবিরাম বৃষ্টি উপভোগ করা বাড়তি পাওনা। বাসমতি চালের ভাত, নানা পদের সবজি, ভর্তা, ডিম, ডাল, তরকারির খাবার খেয়ে দুই জনের বিল মাত্র ৬১০ রূপী, বেশ সাশ্রয়ী হওয়ায় আরো কয়েকবার এ রেষ্টুরেণ্টে খেয়েছি। বৃষ্টি থামলে বিকালে শহর ও ভিক্টোরিয়া পার্ক ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তুতি স্বরূপ বিশ্রামের জন্য রুমে ফিরে এলাম।
আবহাওয়া অনুকূলে নয় বিকেলে তাই ছাতা নিয়েই বেরুতে হলো। হঠাৎ বৃষ্টি আবার হঠাৎ নেই, মেঘ বৃষ্টির লুকোচুরিটা উপভোগ্য। বর্ণ ও চেহারার সাদৃশ্য থাকায় স্থানীয় নাগরিক হিসেবেই ঢুকলাম পার্কে। সুন্দর সাজানো গোছানো ভিক্টোরিয়া পার্ক খুব বড় নয়। অসংখ্য দেশী বিদেশী বৃক্ষ, ফুল গাছ, পাখি রয়েছে পার্কে। একদল পাখির ফটোগ্রাফার বড় বড় ক্যামেরা নিয়ে পাখির ছবি তুলে যাচ্ছে। তাদের ক্যামেরার তুলনায় আমার ডিএসএলআর গণনায় পড়েনা। বৃষ্টির কারণে দর্শনার্থী একেবারেই কম এবং অধিকাংশই বিদেশী। মরক্কো ও চাইনিজ দুটি পরিবার এবং ডেনিস বয়োবৃদ্ধ দম্পত্তির সাথে গল্প আর ছবি তুলে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় শহর দেখতে বেরিয়ে এলাম।
নূয়ারা এলিয়াকে শহর বললে ভুল হবে, মূল শহরটি আমাদের গ্রামাঞ্চলের বড় একটি বাজারের মতো তবে পাহাড়ী জনপদ বহুদূর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। ব্রিটিশরা চা বাগান তৈরী এবং অবকাশ যাপনের জন্য এ পাহাড়ী জনপদ তৈরী করেছে। তারা বহুবছর আগে এখান থেকে চলে গেলেও এ পাহাড়ী জনপদ তাদের সব ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। এখনো প্রতিটি বাড়ীঘর তৈরী হয় ব্রিটিশদের বাড়ীঘরের আদলে। এজন্য এ এলাকাকে বলা হয় “লিটল ইংল্যান্ড”। প্রাণকেন্দ্রেই ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীলংকার অন্যতম পুরাতন পোষ্ট অফিস। হিল ক্লাব, টার্ফ ক্লাব, ভিক্টোরিয়া পার্ক, গ্রেগরি পার্ক, পোষ্ট অফিস এসবই ব্রিটিশরা তাদের প্রয়োজন ও অবকাশ যাপনের জন্য তৈরী করেছে। তারা বসবাসের অনপুযুক্ত এ পাহাড়ী জনপদকে বসবাসের উপযুক্ত করেছে আর শ্রীলংকার জনগন তাদের ঐতিহ্যকে ধরে রেখে নূয়ারা এলিয়াকে পর্যটকদের আকর্ষনীয় এলাকায় পরিনত করেছে।
সন্ধ্যার অন্ধকার ও ঠান্ডার প্রকোপে পাহাড়ী জনপদ নীরব হয়ে গেলো। এখানকার শেষ বাসটি অনেক আগেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে বা এখানে এসে পৌছে গিয়েছে। মদ পান অনুমোদিত বলে সকল সুপার শপে ভদকা, হুইস্কি, বিয়ারসহ দেশি বিদেশী নানা ব্রান্ডের মদ পাওয়া যায় এবং স্থানীয় দোকানগুলোতে ক্রেতা কম নয়। তবে শ্রীলংকায় ধূমপায়ীর সংখ্যা নিতান্তই কম, এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১০ জনকে ধূমপান করতে দেখেছি যাদের অধিকাংশই বিদেশী। সন্ধ্যার পর অন্ধকারের নীরব পাহাড়ী জনপদের মাঝে হেঁটে আলো আঁধারীর অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগের অনুভূতি অন্যরকম। অন্ধকারে কখনো কখনো গা ছমছম করলেও ভালোলাগার অনুভূতির কাছে তা একেবারেই নগন্য। চারিদিকের পরিবেশে মনে হয় এটা কোন শ্রীলংকার পাহাড়ী জনপদ নয় বরং ইংল্যান্ডের কোন পুরাতন শহর। আর এটাই নুয়ারা এলিয়ার সৌন্দর্য্য। রাতের খাবার খেতে আল মদীনা হোটেলে ঢুকে কত্তু রুটি অর্ডার দিলাম। নান রুটি আর চিকেন কেটে কেটে ঝুরাঝুরা করা হয়। স্বাদ একেবারে খারাপ না তাছাড়া বিকট শব্দে প্রস্তুত করার প্রক্রিয়া দেখে খাওয়ার আগ্রহটা এমনিতেই তৈরী হয়। শীতের তীব্রতা উপেক্ষা করা কষ্টকর বিধায় দেরী না করে রুমে ফিরে লেপের গরমে আশ্রয় নিলাম।
সকালে পশ্চিমের জানালা খুলে দিতেই পাহাড়ী অপরূপ সৌন্দর্য্য চোখে পড়লো। পাহাড়ের গাঁয়ে গড়ে উঠেছে সুন্দর একটি গ্রাম। রাতে এসব বাড়ী ও হোটেলের ঝলমলে আলোর ছড়াছড়ি আর দিনে সূর্যের ঠিকরে পড়া রশ্মির ঝলকানি ভিন্নরকম পরিবেশ ও সৌন্দর্য্যের প্রকাশ ঘটায়। চাদর জড়িয়ে হেঁটে চাঞ্চল্যহীন পাহাড়ী গ্রাম ঘুরতে খারাপ লাগেনা। ব্যস্ততা, তারাহুড়ার কোন লক্ষণ নেই। নাস্তা সেরে আশেপাশের চমৎকার কয়েকটি হোটেল দেখতে বের হলাম। পাহাড় কেটে অত্যন্ত সুন্দর অবয়বে নির্মিত এসব হোটেলে সাধারনত বিদেশীরাই অবকাশ যাপনে আসেন। কম বাজেটের কারণে এসব দামী হোটেলে থাকার সুযোগ না জুটলেও সৌন্দর্য্যের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্য হলো। বিশাল গলফ ক্লাবেও যথারীতি বিদেশীদের উপস্থিতি। ১৮৭৬ সালের ইংরেজের নির্মিত হিল ক্লাব একটি বড় টিলার উপরে নির্মিত। প্রায় দেড়শ বছরের এ ক্লাব ও সম্মুখে রাখা একটি পুরাতন আমলের গাড়ী এ স্থাপনার আভিজাত্যের প্রমাণ দেয়। সকাল দশটা অথচ পরিচ্ছনতা কর্মী ও সেন্ট্রির পাহারা ছাড়া চারিদিক একেবারেই নিস্তব্ধ। এসব ঐতিহ্যবাহী হোটেল ও বাড়ীঘরগুলো নূয়ারা এলিয়ার আভিজাত্য।
নূয়ারা এলিয়া ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে। দুইদিনের ভাড়া চুকিয়ে আহমদের পরিবার থেকে বিদায় নিয়ে কলম্বোর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। কলম্বো ৬/৭ ঘন্টার দূরত্ব, তাই দেরী না করে আরেকবার আলোর শহর বা নূয়ারা এলিয়াকে দেখে গাড়ীতে উঠলাম। দুইদিনে পাহাড়ী জনপদ মায়াময়তায় আকর্ষণ তৈরী করেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য্য আর পাহাড়ী জনপদে আরো কয়টা দিন কাটানোর ইচ্ছে দমিয়ে রাখতে হলো। আবারো একই পথে ধীরে ধীরে পাহাড়ী পথ বেয়ে সমতলে নেমে আসতে হবে। চারিদিকে স্রষ্টার অপার সৌন্দর্য্যরে মুগ্ধতা ছেয়ে গেলে পুরো সত্তায়। এ ধরনী প্রভু কত অপরূপ, বিচিত্র করে তৈরী করেছেন।
কলম্বোর উদ্দেশ্যে একটানা চলছে গাড়ী। বৃষ্টি, ট্রাফিক ও পরবর্তী দুই দিনের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের বিপরীতে কলম্বো পৌছতে বেশ বেগ পেতে হলো। রাত ৮.০০ নাগাদ কলম্বো পৌছ
No comments:
Post a Comment