Wednesday, July 4, 2018

আভিজাত্যের ক্যান্ডিতেঃ (তৃতীয় পর্ব)

(তৃতীয় পর্ব)

আভিজাত্যের ক্যান্ডিতেঃ

১৩ ডিসেম্বর, খুব ভোরে শ্রীলংকার বাকী দিনগুলোতে সঙ্গ দেয়ার জন্য দীর্ঘদিনের পরিচিত আব্দুল্লাহ আল মামুন হাজির। মামুন মালেশিয়া, মিশর, সর্বশেষ শ্রীলংকায় পড়ালেখা করছে। প্রায় ১০ বছর পর তার সাথে সাক্ষাৎ করতে শ্রীলংকা আসতে হলো। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসা মুড়ি আর বোম্বে চনাচুর তাকে বুঝিয়ে দিয়ে ৭.৩০ টায় যাত্রা করলাম ক্যান্ডির উদ্দেশ্যে। ট্রেনে যাত্রার ইচ্ছা থাকলেও দূর্ভাগ্যবশতঃ ট্রেন বন্ধ থাকায় মিনি বাসেই ভরসা করতে হলো। পাহাড়, বনের মাঝ দিয়ে ছুটে চলা ঝিকঝিক শব্দে রেলগাড়ীতে ভ্রমনের ইচ্ছা অপূর্ণই থাকলো। কলম্বো থেকে ক্যান্ডির দূরত্ব প্রায় ১৩৫ কি.মি.। সরু এবং মসৃন সড়কে যানবাহনের সংখ্যা খুব কম। গাড়ীর প্রায় অর্ধেক যাত্রী বিদেশী। প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী হওয়ায় বিদেশী পর্যটকদের অধিকাংশই ক্যান্ডি শহর দেখতে যায়।

গ্রাম্য পরিবেশের বুক চিড়ে ছুটে চলা পিচঢালা সড়ক। দুপাশে ফসলের ক্ষেত এবং নানা রকম গাছের বাগান। উঁচু ভবনের দেখা মিলে খুব কম। সমতল কলম্বো থেকে উঁচু নিচু পাহাড়ী পথ পেড়িয়ে পৌছতে হবে ১৫২৬ ফুট উঁচুর ক্যান্ডি শহরে। বয়ে চলা পাহাড়ী খরস্রোতা নদী প্রকৃতিকে করেছে আকর্ষণীয়। রোদের তীব্রতা নেই, স্থানীয়দের চলাফেলা দেখে মনে হয় মাত্রই ভোরের আলো ফুটেছে। প্রকৃতির এ নিয়মতান্ত্রিকতার মাঝে আমরা ১০ বছরের গল্প করতে করতে ছুটে চলছি দ্রুতগতিতে।

দুপুর ১২ টায় ক্যান্ডি পৌছলাম। মধ্যপ্রাচ্যকে শান্ত করতে নাস্তা আর লাঞ্চ একসাথে করলাম স্থানীয় মুসলিম হোটেলে। মামুনের উপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। ছোট শহর ক্যান্ডি হেঁটে ঘুরে ফেলা যায়। অসংখ্য পাহাড়ের উপরে গড়ে উঠেছে প্রাচীন ঐতিহ্যের শহরটি। দুপুরের এ সময় বেশ কোলাহলপূর্ন হলেও বিকেল হতেই শান্ত হয়ে যাবে পাহাড়ী শহরে। প্রয়োজন ছাড়া সন্ধ্যার পরে স্থানীয়দের ঘরের বাহিরে পাওয়া যায়না।

শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল জলধারা। বিশুদ্ধ পানি ধরে রাখার জন্য এ লেক তৈরী করা হয়েছিলো। লেক ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনবসতি। লেকের সুন্দর শান্ত পরিবেশ মনোমুগ্ধকর। মুগ্ধতার পরিমান কয়েকগুন বাড়তো যদি রাতের আলো আঁধারীতে এ লেকের পাড়ে বসে সময় কাটানো যেতো কিন্তু গন্তব্য নূয়ারা এলিয়া হওয়ায় সে সুযোগ হয়নি। লেকের পাড়েই বৌদ্ধদের পবিত্র স্থান গোল্ডেন ট্যাম্পেল। বৌদ্ধ মঠের উপরে স্বর্ণের প্রলেপ থাকায় এর নাম গোল্ডেন ট্যাম্পেল। মার্জিত পোষাক পরিধান করে প্রবেশের করতে হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আগত নারী পুরুষরা সাদা পোষাক পরিধান করেন এবং সংক্ষিপ্ত পোষাকের পর্যটক পুরুষদের জন্য লুঙ্গি আর নারীদের জন্য ওড়না প্রদান করা হয়। সুরক্ষিত এলাকায় উপাসনার ছোট বড় অনেকগুলো মঠ ও রাজার বাড়ী রয়েছে। বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম গোল্ডেন ট্যাম্পেল থেকে।

আবার শহরময় ঘুরার ফাঁকে ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত শ্রীলংকার সবচেয়ে পুরাতন ব্যাংক অব সিলনে ঢুকে ডলার এক্সচেঞ্জ করে নিলাম। এ ব্যাংক এখনো রং, আবয়ব, সেবার মান, ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে চোখে পড়ে বিশাল মসজিদ। শ্রীলংকার প্রতিটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে বড় ও সুন্দর মসজিদ ইসলামের সাথে শ্রীলংকার মানুষের ঐহিত্যগত সম্পর্কের প্রমান বরণ করে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পাশাপাশি মাদ্রাসা, মক্তব থাকায় মসজিদের আবাদ হয় ভালোভাবেই। শহরের প্রানকেন্দ্রে কারাগারের অবয়ব ব্রিটিশ শাসকগনের সাক্ষ্য প্রমাণ করে। বিভিন্ন সড়ক ঘুরে চলে এলাম শহরের এক প্রান্তে।

আকাশে মেঘের ঘনঘটা উপেক্ষা করে ক্যান্ডির উপকন্ঠে প্যারাদেনিয়া ইকো পার্ক ও প্যারদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। বাসে ব্যাগ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভবনা কম তাই ব্যাগ ড্রাইভারের পাশে রেখে ভীড় ঠেলে বাসের ভেতরে প্রবেশ করলাম। নারী পুরুষ, প্রতিবন্ধী ও সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আলাদা সিটের ব্যবস্থা রয়েছে। ইকো পার্কের গেটে পৌছতেই প্রচন্ড বৃষ্টি নামলো। দেশ থেকে টেনে আনা ছাতাটা এখানে কাজে লাগলো। বৃষ্টি বন্ধের লক্ষণ না থাকায় পার্কে প্রবেশ করে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহন করলাম।

বৃষ্টির মাত্রা কিছুটা কমলে পার্কের সবুজ অরণ্যের মাঝে যাত্রা করলাম। পার্কের নিজস্ব গাড়ীর বদলে পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা শ্রেয়। শতবর্ষী অসংখ্য বৃক্ষরাজী ও পরিকল্পিত সবুজ অরণ্যের সমাহার। প্রতিটি বৃক্ষের নাম, পরিচিত আর রোপনের বর্ষ ফলকে লেখা রয়েছে। সবুজ ঘাসের কার্পেটের বিশাল বিশাল মাঠ। বৃষ্টি না থাকলে সবুজ ঘাসে শুয়ে বসে বিশ্রাম নেয়া যায়। অসংখ্য পাক পাখালির কিচির মিচিরে মুখোরিত অরন্য। ক্যালেন্ডার, ছবিতে যেসব সবুজ প্রাঙ্গনের ছবি মনোমুগ্ধকর করে ফুটিয়ে তোলা হয় এ অরন্য ছবিকেও হার মানায়। হেঁটে চলার মসৃণ পথ, দুপাশে বাহারি ফুলের গাছ, অসংখ্য বৃক্ষের মাধ্যমে মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এ সবুজ অরণ্যের শুদ্ধ বাতাসের শ্বাস-প্রশ্বাস মনকে প্রশান্ত করে। বিভিন্ন বয়সের অনেক নারী পুরুষ দর্শনার্থীরা জমায়েত হয়েছে পার্কে। কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়ে ইকো পার্ক থেকে প্যারাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্দেশ্যে পার্ক ত্যাগ করলাম।

মূল সড়কের সাথে দুই একটি ভবন থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে মূল ক্যাম্পাস মেইন রোড থেকে অনেকটা ভেতরে। বিস্তীর্ণ এলাকা বা পুরো একটি গ্রাম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়। পাহাড়ের উপরে উপরে বিভিন্ন ফ্যাকাক্টি, আবাসিক হল। প্রতিটি হল বা ফ্যাকাক্টির দূরত্ব অনেক। নবাগতদের স্বাগত জানানোর জন্য এখনো বিশাল বিলবোর্ড সাটানো রয়েছে। নিরিবিলি এলাকা আর মূল শহর থেকে দূরে হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় একেবারেই কোলাহল মুক্ত। বেশ কয়েকটি ফ্যাকাল্টি  ও হল ঘুরে ফিরে এলাম ক্যান্ডি শহরে।

............... চলবে...............

No comments:

Post a Comment