Wednesday, July 4, 2018

গলের ঐতিহাসিক ডাচ ফোর্টেঃ (দ্বিতীয় পর্ব)

(দ্বিতীয় পর্ব)

গলের ঐতিহাসিক ডাচ ফোর্টেঃ

কলম্বোর স্নিগ্ধ সকাল। নাস্তা সেড়ে হোটেলের লবিতে শ্রীলংকান আইনজীবী মোবারক মুয়াজ্জমের অপেক্ষার সময়টা আগের রাতে পরিচিত শ্রীলংকান মুরুব্বীর সাথে আলাপচারিতায় কেটেছে। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ জানেন। ৭১ এর স্বাধীনতা আন্দোলন, শেখ মুজিব, জিয়া, শেখ হাসিনা,  খালেদা  জিয়া আর বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ে বেশ ধারণা রয়েছে তার। মাশরাফি, মুশফিক, সাকিবদেরও বেশ ভক্ত তিনি। ১০ টায় মুয়াজ্জম আসলে পরিচিত হলাম। সুদর্শন যুবক মুবারক মুয়াজ্জম বেশ আন্তরিক, পিতৃপুরুষ মুর সম্প্রদায়ের। সে একদিকে আইনজীবী অপরদিকে জুমায়ায় খতিব। শ্রীলংকার মানুষ সবাই কালো এ ধারণা পাল্টেছে তার মতো এরকম অনেক সুদর্শণ মানুষদেরকে দেখার কারণে।

মুয়াজ্জমসহ কলম্বো থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিনি বাসে শহরের ভেতরের রাস্তা দিয়ে গল  রওয়ানা  হলাম। বাইপাস সড়ক হয়ে হাইওয়ে বাসে বা ট্রেনে গেলে ট্রাফিকমুক্ত সুন্দর পরিবেশ পাওয়া যেতো। কিন্তু যাত্রায় দেরি হওয়ায় কোনটাই পাওয়া সম্ভব হয়নি। ১০৮ কি.কি দূরত্বের ভাড়া ৩০০ রূপী খুব বেশি না। শ্রীলংকায় বাংলাদেশের মতো সার্বক্ষনিক বাস পাওয়া যায় না, দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে বাস ছাড়বে। পাবলিক বাস ছাড়া উপায় নাই, অল্প কিছু দূর পাল্লার উন্নতমানের বাস চলাচল করে । পিচ ঢালাই রাস্তাগুলোতে  ভাঙ্গা নেই বললেই চলে। সকল প্রকার যানবাহন ও পথচারীরা ট্রাফিক আইন মেনে চলে।  শূন্য সড়কেও সিগন্যাল অমান্য করা, গাড়ীর দ্রুত গতি, ওভার টেকিং বা বিপরীতমুখী রাস্তায় গাড়ী চালাতে দেখা যায়না। রাস্তায় এক্সিডেন্ট  হয় কদাচিৎ। অপরাধের হার খুব কম তাই পুলিশের কাজ নেই বললেই চলে। সবাই নিয়ম শৃংখলা পালনে বেশ আন্তরিক। এসব শ্রীলংকার নিত্যদিনের চিত্র।

সবুজের সমারোহ আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর গলের পুরোটা পথ। একপাশে বিশাল সাগর অন্যপাশে সুন্দর  জনপদ। পথে অসংখ্য নারিকেল বাগান। মুয়াজ্জমের সাথে বাংলাদেশ- শ্রীলংকা, আইনপেশা, বিশ্ব রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে আলাপের একপর্যায়ে সে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলো কিন্তু আমার অতৃপ্ত দুচোখ সবুজ সৌন্দর্য্য উপভোগে ব্যস্ত রইল। দুপুর ২ টা নাগাদ গল বাসষ্ট্যান্ডে নেমে ট্যাক্সি ডেকে ইন্ডিয়ান মুসলিম হোটেলে হালাল খাবারের সন্ধানে চললাম। সাগরের তীরে অপরূপের মুগ্ধতা গ্রহন আর সুস্বাদু কাচ্চি বিরিয়ানী স্বাদ আস্বাদন একসাথে চললো। খাবারের টেবিলে যোগ দিলো মুয়াজ্জম ভাইর বন্ধু ও গল ফোর্টের বাসিন্দা উসমান আনভীর।

লাঞ্চ সেরে ৪৩০ বছরের পুর্তগীজ, ডাচ ও ব্রিটিশদের ঐতিহ্যের গল ফোর্ট ঘুরতে বের হলাম। একসময় অনেক মুসলিম পরিবারের বসবাস ছিলো দুর্গে, কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সম্পত্তি বিক্রি করে অধিকাংশই অন্যত্র আবাসন তৈরী করেছেন । মুসলিম কালচারাল সেন্টার এবং সেন্ট্রাল জামে মসজিদ এ দুর্গে মুসলিম ঐতিহ্যের স্বারক বহন করছে। সুন্দর পরিবেশ নামাজ পড়ে তৃপ্তি অনুভব করলাম। মসজিদের ইমামের সাথে পরিচিত হলে তিনি বেশ সমাদর করলেন। ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত ফোর্টের প্রথম আরবী কলেজে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের সাথে পরিচিত হলাম । তারা অভিনন্দন জানালেন এবং আপ্যায়ন করলেন। ফোর্টের মুসলিম ঐতিহ্যের গল্প শুনালেন, পাঠাগার পাঠদান কক্ষ ঘুরিয়ে দেখালেন। মাদ্রাসা, মসজিদ এ দুর্গে মুসলমানদের সরব উপস্থিতি প্রমাণ করে যা নিঃসন্দেহে মনকে পুলকিত ও প্রশান্ত করে। 

পৃথিবীর দামী জায়গাগুলোর অন্যতম হলো গল ফোর্ট। অসংখ্য বিদেশী লীজ নিয়ে রেষ্টুরেন্ট, বার, হোটেল, নামীদামী ব্রান্ডের শপ চালু করছে। কিছু ডাচ, পুর্তগীজ বনিকগনের উত্তরসূরীরা কয়েকশ বছর  পূর্বের  বাড়ী ঘর আজো সংরক্ষণে রেখেছেন। মসজিদের পাশেই সাগর তীরে কয়েকশত বছরের ঐতিহ্যের লাইট হাউজ। সমুদ্র পথে চলাচলকারী জাহাজের নির্দেশক এ লাইট হাউজ আজও সচল রয়েছে। ফোর্টের তিনদিকে ভারত মহাসাগরের বিশাল জলরাশি এবং স্নিগ্ধ বাতাস দেহ মন প্রফুল্ল ও চঞ্চল করে দেয়। সাগর মাঝে  জেগে থাকা পাথরের দ্বীপ পানির নিচে বিশালত্বের প্রমান দেয়। এখানের ছোট  বীচেই বিদেশীরা সহ অনেক স্থানীয়রা লোনা পানির স্বাদ নিতে নেমে পড়েছেন।

উসমান দুর্গ ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন। গল ফোর্ট জুড়ে কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যের উপস্থিতি। ফোর্টের পূর্বদিকে গল হাইকোর্ট, ডিষ্ট্রিক্ট কোর্ট এবং ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্ট। এখনো এখানে নিয়মিত আদালতে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আশেপাশেই উঁচু নিচু রাস্তার দুই ধারে ফোর্টের সবচেয়ে পুরাতন ভবনগুলোর অবস্থান অর্থাৎ যাদুঘর, হোটেল ওরিয়েন্ট, সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, প্রধান গীর্জাসহ কয়েকশ বছরের স্থাপনা। কয়েকশ বছরের পুরাতন ভবনের সারির মাঝে নিজেকে কয়েকশত বছর পেছনে ঘুরিয়ে আনা যায় নিমিষেই। কোন কোন ভবনের সংস্কার করা হলেও অবয়ব ও অবকাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। ঐতিহ্যকে ধ্বংস না করে অসাধারণ সৃষ্টিশৈলীর ঐতিহ্যের লালন করায় পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থানে রূপ লাভ করছে।

ফোর্টের পশ্চিম দিকে আর্মি ক্যাম্প হয়ে ক্লক টাওয়ারের প্রাঙ্গনে উপস্থিত হলাম। সাগর থেকে অনেক উঁচু প্রাচীর দ্বারা নির্মিত দুর্গ রক্ষা বাঁধ। দুর্গের বাহিরে সমুদ্রের তীরে রয়েছে কোন এক বুজুর্গের কবর। ক্লক টাওয়ার দুর্গের সবচেয়ে উঁচু স্থানে নির্মিত হওয়ায় এখান থেকে পুরো দুর্গ, গল শহর এবং বিস্তীর্ণ সাগরের সৌন্দর্য্য খুব সহজেই চোখে পড়ে। পাশেই দূর্গের শেল্টার হাউজ বা সেফ সেন্টার। সমগ্র দুর্গ আক্রান্ত  হলে দুর্গবাসীদের আশ্রয় নেয়ার সুরক্ষিত স্থান তৈরী করা হয়েছে। ক্লক টাওয়ারের নিচেই দেখা যায় গল  ক্রিকেট স্টেডিয়াম। সুনামীর ধ্বংসজজ্ঞে সমুদ্র তীরের গল শহরকে ফোর্টের মজবুত স্থাপনার কারণে অনেকটা রক্ষা করতে পেরেছে।

ক্লক টাওয়ার থেকে ফিরে এসে উসমানদের বাড়ীতে রসালো ফালুদা দিয়ে আপ্যায়িত হলাম। উসমানরা অষ্টম প্রজন্ম হিসেবে দুর্গে বসবাস করছেন। এখন তার দাদী দুর্গের সকলের নিকট ঐতিহ্যগত বুজর্গ ও সম্মানিত নারী। অনেক মুসলিম নারীরা ধর্মীয় আলোচনায় জমায়েত হয়েছিলো তাদের ঘরে। উসমানে পরিবারের সাথে কুশল বিনিময় ও পারিবারিক সংরক্ষিত ঐতিহ্য ঘুরে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে ফেরার সময় হয়ে এলো। কলম্বোর লম্বা পথ আর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের চোখরাঙ্গানিতে দেরি না করে উসমানকে বিদায় জানিয়ে দুর্গ থেকে বাসষ্ট্যান্ড চলে এলাম। ফেরার সময় হিক্কাদুয়া বীচ যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও রাত হয়ে যাওয়ায় তা আর হয়ে উঠেনি। কিছুদিন থাকার পরিকল্পনা থাকলে এ এলাকার হোটেলে ওঠাই উত্তম। এদিকের আরেকটি সুন্দর ও জনপ্রিয় মাতারা বীচের পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে শ্রীলংকা আসার আগেই।

রাত ১০.৩০ টার শান্ত কলম্বোয় পৌছে মুয়াজ্জাম থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলের  পাশের  সড়কে  বাস থেকে নেমে পড়েছি। অভুক্ত পেটে রেষ্টুরেন্ট খুঁজতে গিয়ে আশাহত হতে হলো। কিছু বার ছাড়া সব বন্ধ থাকায় হোটেলে ফিরে এলাম। সকালে ক্যান্ডির উদ্দেশ্যে যাত্রা তাই হোটেলের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আর ব্যাগ গুছিয়ে পানি দিয়ে অভুক্ত পেট কিছুটা শান্ত করে ঘুমিয়ে গেলাম।

.................. চলবে...................

No comments:

Post a Comment