(প্রথম পর্ব)
শ্রীলংকাঃ মহাসাগরের তিলক একখন্ড বিচিত্র ভূমি
প্রস্তুতির ভুলঃ
কাশ্মীর, দিল্লী ও কলকাতা ভ্রমনের অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে দেশে ফিরে নতুন ভূমিতে পা ফেলার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। গন্তব্য কোথায় হবে? সবুজ পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমনে ভিসার জটিলতা, ব্যস্ততার ফাঁকে সময় বের করা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনেক বড় প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে শফিক ও সাইফুলসহ আব্দুল্লাহ আল মামুনের শ্রীলংকা ভ্রমনের আমন্ত্রন লুফে নিলাম। কিন্তু সাইফুল কাতার এ্যাম্বেসীর চাকুরীতে যোগদানে পিছুটান দিলো তবে নতুন যোগ হলো খায়রুল আনাম ভাই। আমি ও শফিক কলকাতায় একত্রিত হয়ে ট্রেনে চেন্নাই পৌছবো, খায়রুল ভাই সেখানে মিলিত হলে উড়াল দিবো শ্রীলংকার উদ্দেশ্যে। টিকেট ইতিমধ্যে কনফার্ম এবং সকল প্রস্তুতিও সম্পন্ন কিন্তু ইনফরমেশন ও প্রস্তুতিতে আগেই একটি ছোট ভুল হয়ে গিয়েছিলো । যখন ভূলটা ধরা পড়লো তখন আর কিছুই করার ছিলো না। ভূল তথ্যটি সঠিক হিসেবে গ্রহন করার বোকামীতে ইন্ডিয়ার ডাবল এন্ট্রি বা ট্রানজিট ভিসা নেয়া হয়নি।
যাত্রা শুরু আগের দিন যখন জানতে পারলাম ভিসার জটিলতায় চেন্নাই গিয়ে ফিরে আসতে হবে এবং শ্রীলংকা যাওয়া হবেনা এটা মেনে নেয়া বেশ কঠিন ও কষ্টদায়ক ছিলো। সকল প্রস্তুতি ও টিকেট বাতিল করে সফর সাময়িক স্থগিত করতে হলো। শফিক, খাইরুল ভাইও এবার পিছুটান দিলেন। চেন্নাই, দক্ষিণ ভারত হয়ে মুম্বাই, গোয়া ঘুরে আসার ইচ্ছে তৈরী হলেও সঙ্গী না জুটায় মনের ইচ্ছে মনেই চাপা দিয়ে সব প্ন্যান স্থগিত করে বাসায় ঘুম দিলাম আর ওদিকে আমার ট্রেনের সিট আমাকে ছাড়াই ফাঁকা চলে গেলো।
ভিসার এপ্রোভাল থাকা আর মামুনের উৎসাহে শ্রীলংকা যাওয়ার পুনরায় উপায় খুঁজতে লাগলাম। শ্রীলংকায় মামুনের পড়ালেখা একেবারে শেষ পর্যায়ে, নতুন কারো আমন্ত্রনের অপেক্ষা না করে ওর আহবানে সাড়া দিয়ে একাই যাত্রার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সরাসরি ফ্লাইটে না গিয়ে মালিন্দো এয়ারে মালয়েশিয়ার ট্রানজিট ঘুরে শ্রীলংকা যাওয়ার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত। একাকী ভ্রমনের শঙ্কা, উদ্বেগ মনে চাপা দিয়ে প্রস্তুতি নিলাম।
একাকী যাত্রাঃ
ব্যাকপ্যাক ভ্রমনে অভ্যাস পুরনো। ১০ ডিসেম্বর রবিবার ২০১৭ ঢাকার বৃষ্টিস্নাত রাতে ব্যাকপ্যাকার হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, মিরাজ এগিয়ে দিলো এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। কলকাতা বিমানে যাওয়ায় ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা কমবেশী জানা, তাই ইমিগ্রেশন ভীতিটা খুব একটা নেই। কিন্তু হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর মানেই অযাচিত ঝামেলা। কোন কারণ ছাড়াই পাসপোর্ট ও অনলাইন ভিসার এপ্রোভাল কপি চেক করতে নিয়ে গেলো ইমিগ্রেশন অফিসার। শ্রীলংকার ই-ভিসা বা অনঅ্যারাইভাল ভিসার পার্থক্যটা বুঝতে সময় লাগলো আমাদের ইমিগ্রেশন অফিসারের। নিজের আইনজীবী পরিচয়টা বেশ কাজে লেগেছে, ঝামেলা না করে সিনিয়র অফিসার উকিল সাহেবের পাসপোর্ট ওকে করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হলে ফ্লাইটের অপেক্ষা ছাড়া কাজ নেই।
রাত ০১.৪৫ এ প্রায় একঘন্টা দেরীতে মালিন্দোর ‘‘ওডি ৮৮’’ ফ্লাইটটি আমাদের নিয়ে উড়াল দিলো মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। প্রায় ৩ ঘন্টা ৫৫ মিনিটের সফর। একটু পরেই সুস্বাদু ডিনার ও ড্রিংকস নিয়ে হাজির মালয়েশিয়ার লাস্যময়ী এয়ার হোস্টেজ। ডিনার শেষ ঘুম ছাড়া কাজ নেই। আরামদায়ক সিট না হলেও একসময় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন বিমান মালয়েশিয়ার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে। মেঘের ছাদের আবরণে নিচের কিছুই চোখে পড়েনা। ঘড়ির কাটায় কয়টা বাজে তা বুঝার উপায় নেই। মেঘের রাজ্য ভেদ করে একসময় মালেশিয়ার ভূমি স্পর্শ করলো বিমান।
বিমান বেশ দূর থামায় বাসে পৌছে দিলো টার্মিনাল । ফ্লাইটের যাত্রীরা যে যার পথ ধরলে শ্রীলংকা যাওয়ার জন্য আমার কোন সঙ্গী থাকলো না। মনে মৃদু শঙ্কা আর হাতে “ওডি ৬২” এর বোডিং কার্ড নিয়ে পরবর্তী ফ্লাইট খুঁজতে লাগলাম। একজন বাংলাদেশীর সহায়তা পেলাম। হেল্প ডেস্কের মেয়েটিকে টিকেট এগিয়ে দিলে গেট, সময় জানিয়ে দিলো। একাকী ট্রাভেল করার অভিজ্ঞতা এবং মজা বেশ আলাদা। সাহস করে পথ চললেই কোন সমস্যা নেই। নিজের মতো ঘুরা যায়, সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
মালয়েশিয়ার সময় ঢাকা থেকে ২ ঘন্টা বেশী হওয়ায় সময় নিয়ে ঝামেলা হচ্ছিল। টার্মিনালের ঘড়িতে স্থানীয় সময় সকাল ৭.৪০। হাতে সময় নেই, বিশাল টার্মিনাল ঘুরে দেখার ইচ্ছা দমিয়ে রাখলাম ফিরতি পথের জন্য। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নেই, বোডিং এর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানে চেপে বসলাম। আবারো ৩ ঘন্টা ২৫ মিনিটের লম্বা সফর। আমার উইন্ডো সিট থেকে দিনের আলোয় আকাশে ভেসে বেড়ানো দেখার আনন্দ অন্যরমন। বিশাল বিমানে সম্ভবত আমি একাই বাংলাদেশী। পাশের সিটের নেপালী মুরুব্বীর সাথে গল্পে গল্পে উড়ে চলছি নীল আকাশে। উইন্ডো শ্যাডো নামিয়ে দিতেই খানিকটা ঘুম চোখে জড়িয়ে গেলো।
ঘুম ভাঙ্গলে বিমানের জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে দেখলাম সৃষ্টিকর্তার বিশালত্বের নমুনা। শুন্যে ভেসে চলে অবলোকন করলাম সীমাহীন নীল আকাশ আর নিচের বিশাল জলরাশি। বিমান থেকে ভারত মহাসাগরের তিলকের ন্যায় একবিন্দু থেকে ক্রমান্বয়ে বিশাল সিলোন দ্বীপের দেখা মিললো। শ্রীলংকার আকাশের অনেক উপর থেকেই দেখা যায় সবুজের সমারোহ, পাহাড়, নদী-নালা, সুন্দর জনপদ। বিমান ল্যান্ড করলো মাত্র ৩/৪ টি বিমান ল্যান্ড করা ছোট কিন্তু ছিমছাম, ঝকঝকে ও সাজানো শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এয়ারপোর্টে। বিদেশী নাগরিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
বানিজ্যিক রাজধানী কলম্বোতেঃ
ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে টার্মিনালে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ালাম। অননাইনে ভিসার এপ্রোভাল না থাকলে ২৫ ডলার দিয়ে অনঅ্যারাইভাল ভিসা নিতে হচ্ছে কিন্তু আমি এ ঝামেলামুক্ত। লম্বা সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ নেই তাই অল্প সময়েই গিয়ে দাঁড়ালাম সাদা ইউনিফর্মধারী অফিসারের ডেস্কে। পাসপোর্ট, অনলাইন ভিসা, হোটেল বুকিং এর কপি এগিয়ে দিতেই মুচকি হাসি দিয়ে জানতে চাইলেন, “আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?” স্বভাবতই হাসি দিয়ে উত্তর দিলাম, “ইয়েস, ফ্রম বাংলাদেশ”। কেন এসেছি, কত দিন থাকবো? ব্যস এতটুকুই, পাসপোর্টে সিলটামেরে “ওয়েলকাম স্যার” বলে অভিবাদন জানালেন শ্রীলংকা ভ্রমনে আসায় জন্য।
ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হলে ডলার এক্সচেঞ্জ ও সীম ক্রয় করে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করলাম। বাংলাদেশের ১ টাকা=শ্রীলংকান ১.৮৫ রুপী। রিসিভ করার জন্য আসা মুসলিম ড্রাইভার মোহাম্মদকে বেশ কিছুক্ষন খোঁজাখুজির পর পেয়ে অবশেষে কলম্বো শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। মোহাম্মদ কলম্বোতেই পরিবারসহ বসবাস করেন। ভালো ইংরেজি জানেন, এটা শুধু সে নাশ্রীলংকার প্রায় সকল মানুষ ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। সিংহলিজ ও তামিল ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি কমন ল্যাঙ্গুয়েজ হওয়ায় বলা চলে একজন ভিক্ষুক পর্যন্ত ইংরেজি জানেন। পর্যটন শিল্পের প্রয়োজনে যা খুবই আবশ্যক। শ্রীলংকা রাজনীতি, মুসলিমদের অবস্থা, বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা, তার পরিবারসহ নানা বিষয়ে কথায় কথায় কলম্বো শহরে প্রবেশ করলাম।
কলম্বোতে বেশ গরম। গাড়ীর এসিতে বুঝা না গেলেও গাড়ী থেকে নেমে বুঝা গেলো তাপমাত্রা। গন্তব্য ব্যাকপ্যাক লংকা হোষ্টেলে। রাস্তার ধারেই ছিমছাম ৪ তলা ভবনটি হোটেল বললে ভূল হবে আসলে এটি হোষ্টেল বা ডরমেটরি। সিঙ্গেল ট্রাভেলার বা ব্যাকপ্যাকারদের জন্য বেশ উপযুক্ত এরকম হোস্টেলগুলো। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দৈনিক মাত্র ৮/৯ ডলার ভাড়া নিতান্তই কম। চেকইন শেষে রুমে প্রবেশ করে ভিমরি খেলাম এরকম ডরমেটরিতে থাকার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায়। ছোট একটি রুমে দুটি দোতালা বেডে ৪ জনের থাকার ব্যবস্থা। আরেকটু আরামদায়কের চিন্তা করতে গিয়েও থেমে গেলাম কারণ শুধু রাতে ঘুম আর ব্যাগ রাখার জায়গার জন্য এটাই যথেষ্ট।
ফ্রেস হয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম কলম্বোর রাস্তায়। মামুন পরীক্ষায় ব্যস্ত থাকায় কলম্বো থেকে বহুদূর ইষ্টার্ন প্রোভিন্সের ইষ্টার্ণ ইউনিভার্সিটিতে। গুগলকে ইন্সট্রাক্টর বানিয়ে দুইদিন একা ঘুরতে হবে। গুগল ম্যাপের উপর কোন ইন্সট্রাক্টর নেই, শুধু ইন্টারনেট সংযোগ আর স্মার্ট ফোনে চার্জ থাকলেই হলো। কাছেই পেয়ে গেলাম কল্লুপেটিয়া জামে মসজিদ। বৌদ্ধ ধর্মপ্রধান দেশে চারতলা বিশাল মসজিদ দেখে বেশ ভালো লাগলো। প্রশান্ত মনে জোহরের নামাজ আদায় করলাম এখানেই। মসজিদের কাছেই রেষ্টুরেন্টে আপতত মধ্য প্রাচ্য শান্ত করতে হলো। ভাত, ভাজি, ভর্তা আর ডিম ভূনায় দেশীয় স্বাদ। সকল জায়গায় হালাল ও সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়।
প্রথমেই গন্তব্য নির্ধারণ করলাম অর্কিড ইনডিপেন্ডেন্স স্কয়ার। কিন্তু স্থানীয় উচ্চারণে বলতে না পারার কারণে পুলিশ, বাসের হেলপার, সাধারণ মানুষ বা ট্রাক্সি ড্রাইভার কেউ চিনতে পারলো না। মুসকিল আছান করতে মিটার ট্যাক্সিতে চলে গেলাম কলম্বো ইউনিভার্সিটিতে। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির দিয়ে প্রবেশ করলাম। বিশাল আয়তন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আশেপাশে অন্যান্য ফ্যাকাল্টিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ফ্যাকাল্টির সামনে ক্যাফেটোরিয়া, বিশাল মাঠ, অনেক পুরাতন ভবন ছাড়া বড় ইমারত চোখে পড়লো না। এবার “আকেড প্লাজা” বলতে পারায় ট্যাক্সি ড্রাইভার নিয়ে চললো সেই ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কয়ারে। শ্রীলংকার স্বাধীনতার ঐতিহ্য হলো এই স্থাপনা। একপাশে পুরাতন ভবনে যাদুঘর ও দেশি বিদেশী নামী দামী ব্রান্ডের দোকান অন্যপাশে সুন্দর বাগান। বিদেশী অনেক পর্যটকদের মাঝে আমিও একজন। ইউরোপীয় বয়স্ক দম্পত্তি আমার ছবি তুলে দিলেন।
ইনডিপেন্ডেন্স টাওয়ার প্রাঙ্গন থেকে বেড়িয়ে ট্যাক্সি বা বাসে চড়লাম না। গুগল ম্যাপের ডিরেকশনটা এবার ঠিক মতো ধরতে পারলাম, আমার হোটেলের আশেপাশেই ঘুরছি। পায়ে হেটে প্রথমেই দেখলাম কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, কেন্দ্রীয় আর্কাইভ সেন্টার, কলম্বো ক্রিকেট ক্লাব, থিয়েটার ভবন সর্বশেষ যাদুঘর। সাদা রং করা বিশাল ভবনের যাদুঘর বন্ধ হওয়ার আগ মূহুর্তে যাওয়ায় অধিকাংশ গ্যালারি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। টিকেট কাটায় আর বিদেশী হওয়ায় একনজর ঘুরে দেখার সুযোগ দিলো। যাদুঘরে প্রবেশ মূল্য তুলনামূলক বেশী। বিদেশী নাগরিক হিসেবে ১০০০ রূপী, কিন্তু মূল্যের অনুপাতে সংগ্রহশালা পছন্দ হয়নি। শ্রীলংকার পর্যট।
শ্রীলংকাঃ মহাসাগরের তিলক একখন্ড বিচিত্র ভূমি
প্রস্তুতির ভুলঃ
কাশ্মীর, দিল্লী ও কলকাতা ভ্রমনের অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে দেশে ফিরে নতুন ভূমিতে পা ফেলার চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। গন্তব্য কোথায় হবে? সবুজ পাসপোর্টে বিদেশ ভ্রমনে ভিসার জটিলতা, ব্যস্ততার ফাঁকে সময় বের করা আর আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনেক বড় প্রশ্ন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে শফিক ও সাইফুলসহ আব্দুল্লাহ আল মামুনের শ্রীলংকা ভ্রমনের আমন্ত্রন লুফে নিলাম। কিন্তু সাইফুল কাতার এ্যাম্বেসীর চাকুরীতে যোগদানে পিছুটান দিলো তবে নতুন যোগ হলো খায়রুল আনাম ভাই। আমি ও শফিক কলকাতায় একত্রিত হয়ে ট্রেনে চেন্নাই পৌছবো, খায়রুল ভাই সেখানে মিলিত হলে উড়াল দিবো শ্রীলংকার উদ্দেশ্যে। টিকেট ইতিমধ্যে কনফার্ম এবং সকল প্রস্তুতিও সম্পন্ন কিন্তু ইনফরমেশন ও প্রস্তুতিতে আগেই একটি ছোট ভুল হয়ে গিয়েছিলো । যখন ভূলটা ধরা পড়লো তখন আর কিছুই করার ছিলো না। ভূল তথ্যটি সঠিক হিসেবে গ্রহন করার বোকামীতে ইন্ডিয়ার ডাবল এন্ট্রি বা ট্রানজিট ভিসা নেয়া হয়নি।
যাত্রা শুরু আগের দিন যখন জানতে পারলাম ভিসার জটিলতায় চেন্নাই গিয়ে ফিরে আসতে হবে এবং শ্রীলংকা যাওয়া হবেনা এটা মেনে নেয়া বেশ কঠিন ও কষ্টদায়ক ছিলো। সকল প্রস্তুতি ও টিকেট বাতিল করে সফর সাময়িক স্থগিত করতে হলো। শফিক, খাইরুল ভাইও এবার পিছুটান দিলেন। চেন্নাই, দক্ষিণ ভারত হয়ে মুম্বাই, গোয়া ঘুরে আসার ইচ্ছে তৈরী হলেও সঙ্গী না জুটায় মনের ইচ্ছে মনেই চাপা দিয়ে সব প্ন্যান স্থগিত করে বাসায় ঘুম দিলাম আর ওদিকে আমার ট্রেনের সিট আমাকে ছাড়াই ফাঁকা চলে গেলো।
ভিসার এপ্রোভাল থাকা আর মামুনের উৎসাহে শ্রীলংকা যাওয়ার পুনরায় উপায় খুঁজতে লাগলাম। শ্রীলংকায় মামুনের পড়ালেখা একেবারে শেষ পর্যায়ে, নতুন কারো আমন্ত্রনের অপেক্ষা না করে ওর আহবানে সাড়া দিয়ে একাই যাত্রার সিদ্ধান্ত নিতে হলো। সরাসরি ফ্লাইটে না গিয়ে মালিন্দো এয়ারে মালয়েশিয়ার ট্রানজিট ঘুরে শ্রীলংকা যাওয়ার পরিকল্পনা পাকাপোক্ত। একাকী ভ্রমনের শঙ্কা, উদ্বেগ মনে চাপা দিয়ে প্রস্তুতি নিলাম।
একাকী যাত্রাঃ
ব্যাকপ্যাক ভ্রমনে অভ্যাস পুরনো। ১০ ডিসেম্বর রবিবার ২০১৭ ঢাকার বৃষ্টিস্নাত রাতে ব্যাকপ্যাকার হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে, মিরাজ এগিয়ে দিলো এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। কলকাতা বিমানে যাওয়ায় ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা কমবেশী জানা, তাই ইমিগ্রেশন ভীতিটা খুব একটা নেই। কিন্তু হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর মানেই অযাচিত ঝামেলা। কোন কারণ ছাড়াই পাসপোর্ট ও অনলাইন ভিসার এপ্রোভাল কপি চেক করতে নিয়ে গেলো ইমিগ্রেশন অফিসার। শ্রীলংকার ই-ভিসা বা অনঅ্যারাইভাল ভিসার পার্থক্যটা বুঝতে সময় লাগলো আমাদের ইমিগ্রেশন অফিসারের। নিজের আইনজীবী পরিচয়টা বেশ কাজে লেগেছে, ঝামেলা না করে সিনিয়র অফিসার উকিল সাহেবের পাসপোর্ট ওকে করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হলে ফ্লাইটের অপেক্ষা ছাড়া কাজ নেই।
রাত ০১.৪৫ এ প্রায় একঘন্টা দেরীতে মালিন্দোর ‘‘ওডি ৮৮’’ ফ্লাইটটি আমাদের নিয়ে উড়াল দিলো মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে। প্রায় ৩ ঘন্টা ৫৫ মিনিটের সফর। একটু পরেই সুস্বাদু ডিনার ও ড্রিংকস নিয়ে হাজির মালয়েশিয়ার লাস্যময়ী এয়ার হোস্টেজ। ডিনার শেষ ঘুম ছাড়া কাজ নেই। আরামদায়ক সিট না হলেও একসময় ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভাঙ্গলো তখন বিমান মালয়েশিয়ার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে। মেঘের ছাদের আবরণে নিচের কিছুই চোখে পড়েনা। ঘড়ির কাটায় কয়টা বাজে তা বুঝার উপায় নেই। মেঘের রাজ্য ভেদ করে একসময় মালেশিয়ার ভূমি স্পর্শ করলো বিমান।
বিমান বেশ দূর থামায় বাসে পৌছে দিলো টার্মিনাল । ফ্লাইটের যাত্রীরা যে যার পথ ধরলে শ্রীলংকা যাওয়ার জন্য আমার কোন সঙ্গী থাকলো না। মনে মৃদু শঙ্কা আর হাতে “ওডি ৬২” এর বোডিং কার্ড নিয়ে পরবর্তী ফ্লাইট খুঁজতে লাগলাম। একজন বাংলাদেশীর সহায়তা পেলাম। হেল্প ডেস্কের মেয়েটিকে টিকেট এগিয়ে দিলে গেট, সময় জানিয়ে দিলো। একাকী ট্রাভেল করার অভিজ্ঞতা এবং মজা বেশ আলাদা। সাহস করে পথ চললেই কোন সমস্যা নেই। নিজের মতো ঘুরা যায়, সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
মালয়েশিয়ার সময় ঢাকা থেকে ২ ঘন্টা বেশী হওয়ায় সময় নিয়ে ঝামেলা হচ্ছিল। টার্মিনালের ঘড়িতে স্থানীয় সময় সকাল ৭.৪০। হাতে সময় নেই, বিশাল টার্মিনাল ঘুরে দেখার ইচ্ছা দমিয়ে রাখলাম ফিরতি পথের জন্য। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা নেই, বোডিং এর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিমানে চেপে বসলাম। আবারো ৩ ঘন্টা ২৫ মিনিটের লম্বা সফর। আমার উইন্ডো সিট থেকে দিনের আলোয় আকাশে ভেসে বেড়ানো দেখার আনন্দ অন্যরমন। বিশাল বিমানে সম্ভবত আমি একাই বাংলাদেশী। পাশের সিটের নেপালী মুরুব্বীর সাথে গল্পে গল্পে উড়ে চলছি নীল আকাশে। উইন্ডো শ্যাডো নামিয়ে দিতেই খানিকটা ঘুম চোখে জড়িয়ে গেলো।
ঘুম ভাঙ্গলে বিমানের জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে দেখলাম সৃষ্টিকর্তার বিশালত্বের নমুনা। শুন্যে ভেসে চলে অবলোকন করলাম সীমাহীন নীল আকাশ আর নিচের বিশাল জলরাশি। বিমান থেকে ভারত মহাসাগরের তিলকের ন্যায় একবিন্দু থেকে ক্রমান্বয়ে বিশাল সিলোন দ্বীপের দেখা মিললো। শ্রীলংকার আকাশের অনেক উপর থেকেই দেখা যায় সবুজের সমারোহ, পাহাড়, নদী-নালা, সুন্দর জনপদ। বিমান ল্যান্ড করলো মাত্র ৩/৪ টি বিমান ল্যান্ড করা ছোট কিন্তু ছিমছাম, ঝকঝকে ও সাজানো শ্রীমাভো বন্দরনায়েক এয়ারপোর্টে। বিদেশী নাগরিকদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
বানিজ্যিক রাজধানী কলম্বোতেঃ
ব্যাগটি কাঁধে ঝুলিয়ে টার্মিনালে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ালাম। অননাইনে ভিসার এপ্রোভাল না থাকলে ২৫ ডলার দিয়ে অনঅ্যারাইভাল ভিসা নিতে হচ্ছে কিন্তু আমি এ ঝামেলামুক্ত। লম্বা সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ নেই তাই অল্প সময়েই গিয়ে দাঁড়ালাম সাদা ইউনিফর্মধারী অফিসারের ডেস্কে। পাসপোর্ট, অনলাইন ভিসা, হোটেল বুকিং এর কপি এগিয়ে দিতেই মুচকি হাসি দিয়ে জানতে চাইলেন, “আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?” স্বভাবতই হাসি দিয়ে উত্তর দিলাম, “ইয়েস, ফ্রম বাংলাদেশ”। কেন এসেছি, কত দিন থাকবো? ব্যস এতটুকুই, পাসপোর্টে সিলটামেরে “ওয়েলকাম স্যার” বলে অভিবাদন জানালেন শ্রীলংকা ভ্রমনে আসায় জন্য।
ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হলে ডলার এক্সচেঞ্জ ও সীম ক্রয় করে যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করলাম। বাংলাদেশের ১ টাকা=শ্রীলংকান ১.৮৫ রুপী। রিসিভ করার জন্য আসা মুসলিম ড্রাইভার মোহাম্মদকে বেশ কিছুক্ষন খোঁজাখুজির পর পেয়ে অবশেষে কলম্বো শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। মোহাম্মদ কলম্বোতেই পরিবারসহ বসবাস করেন। ভালো ইংরেজি জানেন, এটা শুধু সে নাশ্রীলংকার প্রায় সকল মানুষ ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন। সিংহলিজ ও তামিল ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি কমন ল্যাঙ্গুয়েজ হওয়ায় বলা চলে একজন ভিক্ষুক পর্যন্ত ইংরেজি জানেন। পর্যটন শিল্পের প্রয়োজনে যা খুবই আবশ্যক। শ্রীলংকা রাজনীতি, মুসলিমদের অবস্থা, বাংলাদেশ সম্পর্কে ধারণা, তার পরিবারসহ নানা বিষয়ে কথায় কথায় কলম্বো শহরে প্রবেশ করলাম।
কলম্বোতে বেশ গরম। গাড়ীর এসিতে বুঝা না গেলেও গাড়ী থেকে নেমে বুঝা গেলো তাপমাত্রা। গন্তব্য ব্যাকপ্যাক লংকা হোষ্টেলে। রাস্তার ধারেই ছিমছাম ৪ তলা ভবনটি হোটেল বললে ভূল হবে আসলে এটি হোষ্টেল বা ডরমেটরি। সিঙ্গেল ট্রাভেলার বা ব্যাকপ্যাকারদের জন্য বেশ উপযুক্ত এরকম হোস্টেলগুলো। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দৈনিক মাত্র ৮/৯ ডলার ভাড়া নিতান্তই কম। চেকইন শেষে রুমে প্রবেশ করে ভিমরি খেলাম এরকম ডরমেটরিতে থাকার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায়। ছোট একটি রুমে দুটি দোতালা বেডে ৪ জনের থাকার ব্যবস্থা। আরেকটু আরামদায়কের চিন্তা করতে গিয়েও থেমে গেলাম কারণ শুধু রাতে ঘুম আর ব্যাগ রাখার জায়গার জন্য এটাই যথেষ্ট।
ফ্রেস হয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম কলম্বোর রাস্তায়। মামুন পরীক্ষায় ব্যস্ত থাকায় কলম্বো থেকে বহুদূর ইষ্টার্ন প্রোভিন্সের ইষ্টার্ণ ইউনিভার্সিটিতে। গুগলকে ইন্সট্রাক্টর বানিয়ে দুইদিন একা ঘুরতে হবে। গুগল ম্যাপের উপর কোন ইন্সট্রাক্টর নেই, শুধু ইন্টারনেট সংযোগ আর স্মার্ট ফোনে চার্জ থাকলেই হলো। কাছেই পেয়ে গেলাম কল্লুপেটিয়া জামে মসজিদ। বৌদ্ধ ধর্মপ্রধান দেশে চারতলা বিশাল মসজিদ দেখে বেশ ভালো লাগলো। প্রশান্ত মনে জোহরের নামাজ আদায় করলাম এখানেই। মসজিদের কাছেই রেষ্টুরেন্টে আপতত মধ্য প্রাচ্য শান্ত করতে হলো। ভাত, ভাজি, ভর্তা আর ডিম ভূনায় দেশীয় স্বাদ। সকল জায়গায় হালাল ও সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়।
প্রথমেই গন্তব্য নির্ধারণ করলাম অর্কিড ইনডিপেন্ডেন্স স্কয়ার। কিন্তু স্থানীয় উচ্চারণে বলতে না পারার কারণে পুলিশ, বাসের হেলপার, সাধারণ মানুষ বা ট্রাক্সি ড্রাইভার কেউ চিনতে পারলো না। মুসকিল আছান করতে মিটার ট্যাক্সিতে চলে গেলাম কলম্বো ইউনিভার্সিটিতে। সায়েন্স ফ্যাকাল্টির দিয়ে প্রবেশ করলাম। বিশাল আয়তন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, আশেপাশে অন্যান্য ফ্যাকাল্টিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ফ্যাকাল্টির সামনে ক্যাফেটোরিয়া, বিশাল মাঠ, অনেক পুরাতন ভবন ছাড়া বড় ইমারত চোখে পড়লো না। এবার “আকেড প্লাজা” বলতে পারায় ট্যাক্সি ড্রাইভার নিয়ে চললো সেই ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কয়ারে। শ্রীলংকার স্বাধীনতার ঐতিহ্য হলো এই স্থাপনা। একপাশে পুরাতন ভবনে যাদুঘর ও দেশি বিদেশী নামী দামী ব্রান্ডের দোকান অন্যপাশে সুন্দর বাগান। বিদেশী অনেক পর্যটকদের মাঝে আমিও একজন। ইউরোপীয় বয়স্ক দম্পত্তি আমার ছবি তুলে দিলেন।
ইনডিপেন্ডেন্স টাওয়ার প্রাঙ্গন থেকে বেড়িয়ে ট্যাক্সি বা বাসে চড়লাম না। গুগল ম্যাপের ডিরেকশনটা এবার ঠিক মতো ধরতে পারলাম, আমার হোটেলের আশেপাশেই ঘুরছি। পায়ে হেটে প্রথমেই দেখলাম কেন্দ্রীয় লাইব্রেরী, কেন্দ্রীয় আর্কাইভ সেন্টার, কলম্বো ক্রিকেট ক্লাব, থিয়েটার ভবন সর্বশেষ যাদুঘর। সাদা রং করা বিশাল ভবনের যাদুঘর বন্ধ হওয়ার আগ মূহুর্তে যাওয়ায় অধিকাংশ গ্যালারি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। টিকেট কাটায় আর বিদেশী হওয়ায় একনজর ঘুরে দেখার সুযোগ দিলো। যাদুঘরে প্রবেশ মূল্য তুলনামূলক বেশী। বিদেশী নাগরিক হিসেবে ১০০০ রূপী, কিন্তু মূল্যের অনুপাতে সংগ্রহশালা পছন্দ হয়নি। শ্রীলংকার পর্যট।
No comments:
Post a Comment