Tuesday, June 26, 2018

পটলের চাষ পদ্ধতি



পটল একটি জনপ্রিয় উচ্চমূল্য সবজি। পটল খরিপ মৌসুমের সবজি হলেও বর্তমানে সারা বছর ধরেই পাওয়া যায়। গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালে বাজারে যখন অন্যান্য সবজি কম পাওয়া যায় তখন পটল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের জলবায়ু ও আবহাওয়া পটল চাষের উপযোগী। দেশের সকল এলাকাতেই পটল চাষ করা সম্ভব।
পটলের পুষ্টিগুণ
উচ্চ পুষ্টিমান ও বহুবিধ ব্যবহারের জন্য পটল সবার পছন্দের একটি সবজি। খাবার উপযোগী প্রতি ১০০ গ্রাম পটলে রয়েছে ২.৪ গ্রাম প্রোটিন, ৪.১ গ্রাম শ্বেতসার, ০.৬ গ্রাম চর্বি, ৭৯০ মা.গ্রা. ক্যারোটিন, ০.৩০ মি.গ্রা. ভিটামিন বি-১, ০.০৩ মি.গ্রা. ভিটামিন বি-২, ২৯ মি.গ্রা. ভিটামিন সি, ২০ মি.গ্রা. ক্যালসিয়াম, ১.৭ মি.গ্রা. আয়রন, এবং ৩১ কিলো ক্যালরি খাদ্যশক্তি।
পটল চাষে জলবায়ু
পটল গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং ফলনের জন্য উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া প্রয়োজন। পটলের জন্য উচ্চতর তাপমাত্রা এবং অধিক সূর্যালোক প্রয়োজন হয়। বৃষ্টিপাতের আধিক্য ফুলের পরাগায়নে বিঘ্ন ঘটায় এবং ফলন কমে যায়।
পটল চাষে মাটি
পানি নিষ্কাশনের সুবিধা আছে এমন উঁচু ও মাঝারী উঁচু জমি এবং বেলে দো-আঁশ থেকে দো-আঁশ মাটি পটল চাষের জন্য উপযোগী। পটল বেশ খরা সহিষ্ণু। তবে পানির ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে ফলন কমে যায়।
পটলের জাত
বাংলাদেশে পটলের বিভিন্ন জাত রয়েছে। তার মধ্যে বারি পটল-১ ও বারি পটল-২ অন্যতম। এ জাতগুলো উচ্চ ফলনশীল এবং রোগবালাই সহিষ্ণু।
বারি পটল-১
ফলের আকার মাঝারি, বেলুনাকৃতি ও দু´প্রান্ত ভোতা
ফলের রঙ গাঢ় সবুজ, গায়ে ৯-১০টি হালকা সবুজ রঙের ডোরা থাকে
ফল ৯-১০ সেমি. লম্বা এবং প্রস্থ ৪.০-৪.৫ সেমি.
বারি পটল-২
ফলের আকার বড়, সিলিন্ডারাকৃতি ও দু´প্রান্ত সূঁচালো
ফলের রঙ হালকা সবুজ, গায়ে ১০-১১টি সাদা রঙের ডোরা থাকে
ফল ১১-১২ সেমি. লম্বা এবং প্রস্থ ৩.৫-৪.০ সেমি.
পটল চাষে রোপণের সময়
বর্ষার শেষে আশ্বিন-কার্তিক মাস এবং শীতের শেষে ফাল্গুন-চৈত্র মাস পটল লাগানোর উপযুক্ত সময়।
পটল চাষে চারা উৎপাদন
পটল চাষের জন্য বীজ, শাখা কলম ও কন্দ মূল সব পদ্ধতিতেই পটলের বংশ বিস্তার করা যায়। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক চাষের জন্য শাখা কলম ও কন্দ মূল ব্যবহার করা ভালো এবং লাভজনক। বীজতলায় কিংবা সরাসরি জমিতে শাখা কলম বা কন্দ মূল লাগিয়ে চারা উৎপাদন করা যায়। কন্দ মূল ৩-৪টি চোখসহ কেটে মাদায় লাগালে কম কন্দ মূল দিয়ে বেশি জমিতে পটল চাষ করা যায়। বীজ থেকে চারা পাওয়া সম্ভব হলেও নিম্নলিখিত কারণে বংশবিস্তারের জন্য বীজ ব্যবহৃত করা হয় না:
১.বীজের অঙ্কুরণ অনিয়মিত
২.বীজের চারার মধ্যে শতকরা ৫০% পুরুষ জাত
৩.বীজের চারা থেকে ফল পেতে দীর্ঘসূত্রিতা
পটল চাষে জমি তৈরি ও রোপণ

আমাদের দেশে পটলের চাষ করা হয় বাণিজ্যিকভাবে। পটলের জমি গভীর করে ৪-৫ টি আড়াআড়ি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে প্রস্তুত করতে হবে। জমি চাষ করার পর বেড তৈরি করে নিতে হবে। বেড পদ্ধতিতে পটল চাষ করা ভাল। এতে বর্ষাকালে ক্ষেত নষ্ট হয় না। সাধারণত একটি বেড ১.০-১.৫ মিটার চওড়া হয়। বেডের মাঝামাঝি এক মিটার থেকে দেড় মিটার পর পর মাদায় চারা রোপণ করতে হবে। এক বেড থেকে আর এক বেডের মাঝে ৭৫ সেমি. নালা রাখতে হবে। মাদা বা পিট তৈরি মাদা বা পিটের আকার- দৈর্ঘ্য- ৫০ সেমি. প্রস্থ- ৫০ সেমি. গভীরতা- ৪০ সেমি. নালা- ৭৫ সেমি. মাদা থেকে মাদার দূরত্ব-১.০-১.৫ মিটার মাদায় গাছের দূরত্ব-৭.০-১০.০ সেমি. গভীরতা-৫০ সেমি. মোথার সংখ্যা ১০,০০০ হেক্টর স্ত্রী গাছপ্রতি ১০টি স্ত্রী গাছের জন্য ১টি পুরুষ গাছ যথাযথ পরাগায়নের ক্ষেত্রে ১০% পুরুষ জাতের গাছ লাগানো উচিত এবং এসব গাছ ক্ষেতের সব অংশে সমানভাবে ছড়িয়ে লাগাতে হবে।
পটল চাষে সার প্রয়োগ পদ্ধতি
পটলের ভাল ফলন পেতে হলে গোবর বা আবর্জনা সার ভালোভাবে পচানো দরকার। পটল দীর্ঘমেয়াদি সবজি ফসল, এ জন্য মে মাস থেকে ফসল সংগ্রহের পর প্রতি মাসে হেক্টরপ্রতি ১৮ কেজি ইউরিয়া, ২৫ কেজি টিএসপি এবং ১৪ কেজি এমপি সার উপরি প্রয়োগ করা প্রয়োজন। এতে ফলন বেশি হবে।
পটল ক্ষেতের পরিচর্যা
পটল একটি লতানো উদ্ভিদ। পটল গাছ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে জমিতে মাচা তৈরি করে ইহার গোড়ায় বাঁশের কঞ্চি বা কাঠি পুঁতে মাচায় তুলে দিতে হবে। এক মিটার উচ্চতায় মাচা বা বাউনি দিলে পটলের ফলন প্রায় দ্বিগুণ হয়। পটলের মাচা বা বাউনি দুই ভাবে দেয়া যায়। বাঁশের তৈরি আনুভূমিক এবং রশি দ্বারা তৈরি খাড়া বা উল্লম্ব। মাচার দৈর্ঘ ও প্রস্থ হবে বেডের সমান। পটলের মাচা বা বাউনি বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাই অনেক এলাকায় পটল চাষীরা বাউনির বদলে মাটির উপর খর-কুটা বা কচুরিপানা দিয়ে তার উপর গাছ তুলে দেয়। এতেও ভাল ফলন পাওয়া যায় এবং উৎপাদন খরচও কম হয়। প্রতিবার ফসল সংগ্রহের পর মরা, রোগ ও পোকা আক্রান্ত পাতা ও শাখা ছাঁটাই করতে হবে। এতে ফলধারী নতুন শাখার সংখ্যা বেড়ে যায় এবং ফলন বেশি হয়।
পটল চাষে আগাছা দমন
পটলের জমিতে নানা ধরণের আগাছা জন্ম নেয়। এসব আগাছা জমি থেকে খাদ্য গ্রহণ করে পটল গাছকে দুর্বল করে দেয় ফলে পটলের ফলন কমে যায়। তাই পটলের জমি সবসময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
পটল চাষে পরাগায়ন
পটল চাষের ক্ষেত্রে কৃত্রিম পরাগায়ন একটি জরুরি বিষয়। চারা লাগানোর তিন মাসের মধ্যে পটলের ফুল আসতে শুরু করে। পটল একটি পরপরাগায়িত উদ্ভিদ। স্ত্রী ফুল ও পুরুষ ফুল আলাদা গাছে ফোটে। কাজেই পরাগায়ন না হলে পটলের ফলন পাওয়া যাবে না। পটলের পরাগায়ন সাধারণত বাতাস এবং কীটপতঙ্গের দ্বারা হয়ে থাকে। তবে জমিতে পুরুষ ফুলের সংখ্যা খুব কমে গেলে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করা প্রয়োজন হয়। পটল গাছে পরাগায়নের জন্য স্ত্রী ও পুরুষ ফুল দরকার। একটি সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল তুলে নিন এবং পুংকেশর নির্বাচন করে ফুলের পাপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলুন। তারপর প্রতিটি স্ত্রী ফুলের ম স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডের ওপর ২-৩ ফোঁটা ব্যবহার করেও পরাগায়ন সম্পন্ন করা যায়। এ পদ্ধতিতে পটলের ফলন অনেক বৃদ্ধি পায়।
মুড়ি ফসল
পটল গাছ থেকে প্রথম বছর ফসল সংগ্রহ করার পর গাছের গোড়া নষ্ট না করে রেখে দিয়ে পরবর্তী বছর পরিচর্যার মাধ্যমে গুড়িচারা থেকে যে ফসল পাওয়া যায় তাকেই মুড়ি ফসল বলে।
পটল চাষে রোগ বালাই
ফলের মাছিপোকা
এ পোকা পটলের বেশ ক্ষতি করে। স্ত্রী পোকা কচি ফলের ত্বক ছিদ্র করে ভিতরে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়া বেড় হয়ে ফলের ভিতরের নরম অংশ খায়। এতে পটল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় ফল ঝরে যায়।
প্রতিকার
জমি পরিষ্কার রাখতে হবে। আক্রান্ত ফল দেখা মাত্র সংগ্রহ করে মাটিতে পুতে ফেলতে হবে। বিষটোপ বা ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করে পোকা দমন করতে হবে। নাহলে কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
কাঁঠালে পোকা
পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া পাতার সবুজ অংশ খেয়ে জালের মতো ঝাঝরা করে ফেলতে পারে। ফলে পাতা শুকিয়ে মরে যায় এবং গাছ আস্তে আস্তে পাতাশূণ্য হয়ে পড়ে। আক্রমণ তীব্র হলে গাছ মারা যায়।
প্রতিকার
এ পোকার আক্রমণ দেখামাত্রই পাতাসহ পোকার ডিম ও কীড়া সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলতে হবে। নিম বীজের মিহিগুড়া ৩০-৪০ গ্রাম এক লিটার পানিতে ১২-১৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে পানি ছেকে নিয়ে ঐ পানি আক্রান্ত গাছে স্প্রে করলে পোকা দমন হয়। অথবা কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে।
পটল সংগ্রহ
পটল কচি অবস্থায় সংগ্রহ করা উচিত। জাতভেদে ফুল ফোটার ১০-১২ দিন পর পটল সংগ্রহের উপযোগী হয়। পটল এমন পর্যায়ে সংগ্রহ করা উচিত যখন ফলটি পূর্ণ আকার প্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু পরিপক্ক হয়নি।
পটল চাষে ফলন
জাত ও পরিচর্যার উপর পটলের ফলন নির্ভর করে। আধুনিক জাতগুলো চাষ করলে এবং সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে বিঘাপ্রতি ৪০০০ থেকে ৫০০০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।

No comments:

Post a Comment